পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালির কাছে একরাশ নস্টালজিয়া আর নতুনের আবাহন। আজ বঙ্গাব্দের এই শুভ লগ্নে যখন বাংলার ঘরে ঘরে হালখাতা আর মিষ্টিমুখের উৎসব, তখন এই বিশেষ দিনটি নিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়লেন বর্ষীয়ান অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কিন্তু পয়লা বৈশাখ যেন সব উৎসবের ঊর্ধ্বে এক পরম প্রাপ্তি। বৈশাখী উদ্যাপনে ভাসছে বাংলা। এ বছর নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে গিয়ে অভিনেতা বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী জানালেন, পয়লা বৈশাখ তাঁর কাছে কেবল একটি দিন নয়, বরং এক অনবদ্য অনুভূতি। ককথায় কথায় তিনি ফিরে গেলেন তাঁর ছোটবেলার দিনগুলোতে।
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে টালিগঞ্জের চারু অ্যাভিনিউতে। ছিমছাম, মধ্যবিত্ত পাড়া। গাছপালা ঘেরা, ছোট ছোট বাড়ি, ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে রাস্তা... সব মিলিয়ে কী যে অদ্ভুত সুন্দর ছিল আমাদের পাড়াটা। পয়লা বৈশাখে নতুন জামা আর বড়দের আশীর্বাদ নেওয়ার ধুমই ছিল আলাদা। সে দিনগুলোতে আমরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিতাম, তারপর বাড়িতে পুজো হতো। নতুন জামা পরে জমিয়ে বাঙালি ভূরিভোজ— এই ছিল আমাদের বৈশাখ। আর মিষ্টি ছাড়া তো এই উৎসব অসম্পূর্ণ! মিষ্টির মাধ্যমেই তো আমরা ভালবাসা আর স্নেহ ছড়িয়ে দেওয়া হত সবার মধ্যে।
বলতে বলতে বেশ খানিকটা আনমনা হয়ে খানিক থামলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। এরপর অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, “বেশ মনে আছে, ছোটবেলায় সেদিন আমাদের বাড়িতে হতো খাসির মাংস এবং ভাত। শেষপাতে মিষ্টি। সেই স্বাদ আজও মুখে লেগে রয়েছে। জানেন, আমার পিসেমশাইয়ের একটা বেকারি ছিল। খুব আধুনিক কিছু ছিল না এখনকার মতো...তবে বড় বেকারি। কেক, প্যাস্ট্রি, পাউরুটি, বিস্কুট কত কী...সন্ধ্যেবেলায় সেখানে যেতাম। খাওয়াদাওয়া, ঠাণ্ডা পানীয়, শরবত চলত দেদার। পাড়ায় বিভিন্ন দোকানে তো আমাদের নিমন্ত্রণ থাকতই। আসলে কী জানেন, তখন আয়কর আইনের এত নিয়মের চোখরাঙানি ছিল না...মানে বলতে চাইছি কেউ নভেম্বর-ডিসেম্বরে ট্যাক্স ক্লিয়ার করত কেউ বা অন্য কোনও মাসে। কিন্তু যেটা হতো পাড়ার ওই দোকানগুলোতে চৈত্রের শেষ দিনে একটা মোটা কালেকশন হতো টাকার। বকেয়া থাকা বেশিরভাগ টাকা জমা পড়ত। তাই পয়লা বৈশাখের দিন মিষ্টি, খাবার খাইয়ে চলত আনন্দ।”
আর একটা কথা। আমাদের পাড়ায় জলসা হত। সেখানে অভিনয়ে হাত মকশো করতে করতেই আজ আমি এখানে। আমরা ছেলেপুলেরাই ছোটাছুটি করে সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জোগাড়যন্ত্র করতাম। দেখুন, আমাদের পৰ তো মধ্যবিত্তের পাড়া ছিল, তাই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় অথবা মান্না দে-কে কোনওদিনও সেই জলসায় আনতে পারিনি। কিন্তু প্রচুর মান্না-হেমন্তকন্ঠীরা গেয়ে যেতেন আর কী গানটাই না গাইতেন! খুব জমাটি ব্যাপার হত। আমরা নাটক করতাম তারপর। মেয়েরা নাচের অনুষ্ঠান করত। দু’চোখ ভরে দেখতাম! ” বলতে বলতে হেসে উঠলেন অভিনেতা।
“বুঝলেন, সেটা ছিল চিঠির যুগ। আড়চোখে তাকানোর সময়। পয়লা বৈশাখেও মন দেওয়া নেওয়া চলত। চিঠিচাপাটি চলত এর-ওর হাত ধরে। মেয়েরা তো ওই ভাললাগার চিঠি পেতই, ছেলেরাও কিন্তু পেত! আর সে কী আনন্দ। ওই শিহরণ ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো যাবে না। এখন তো গিয়েছে। বয়সও বেড়েছে আমার অনেকটাই। তবে পুরনো পাড়ার সঙ্গে কিন্তু যোগাযোগ আছে। কোনও কোনও বছর এই হালখাতার দিনে পুরনো পাড়াতেও ঢুঁ মেরে যাই, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি, যেসব জায়গায় আমাদের ওই পাড়ার জলসটা হতো একবার ছুঁয়ে আসি। মন ভাল হয়ে যায়।
আজ সকাল থেকে শুটিং করেছি, ডাবিংয়ের ও কাজ ছিল, সেটাও সেরেছি। নববর্ষের প্রথম দিন কাজ, মন্দ লাগে না। আর এখন একটু পরে বাড়িতে আমার কিছু বন্ধু আসবে, ছেলের বন্ধুরা আসবে তাঁদের পরিবার নিয়ে। সবাই মিলে একটু খাওয়াদাওয়া, আড্ডা মারব। গল্প হবে, হাসি হবে। এটাও কম পাওয়া নাকি নববর্ষে?”
নস্টালজিয়া, সম্পর্ক আর ছোট ছোট সুখ। সব মিলিয়ে বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী-র কাছে পয়লা বৈশাখ আজও ঠিক ততটাই উজ্জ্বল, যতটা ছিল ছোটবেলায়।















