অভিনেতার অকালমৃত্যুতে সরগরম টলিউড। প্রত্যেকটি শুটিংয়ে অনেকেই বলেছেন, আউটডোর শুটিংয়ে সত্যিই সেই অর্থে কোনও নিরাপত্তা থাকে না। তাঁরা নিরসত্তার অভাব বোধ করেন। শুটিংয়ে একটা সেফটি মেসার থাকা উচিত বলেই মত শিল্পী থেকে টেকনিশিয়ান সহ সকলের। সেই সেফটি মেসার কী হতে পারে জানাচ্ছেন টলিউডের পরিচালক, প্রযোজকরা। শুনলেন পরমা দাশগুপ্ত।
আউটডোর শুট মানেই দেদার মজা। এমনটাই বরাবর জানে টলিপাড়া। কিন্তু সদ্য তেমনই এক শুটিংয়ে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুতে এখন শোকে মুহ্যমান গোটা ইন্ডাস্ট্রি। ধারাবাহিক ‘ভোলে বাবা পার করেগা’র শুটিংয়ের অনুমতি থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে প্রযোজনা সংস্থা থেকে শুটিং ইউনিট। শোক, ক্ষোভ প্রকাশ, বিতর্ক থেকে চাপানউতোর— সব মিলিয়েই এখন তুমুল শোরগোল টলিপাড়ায়।
ধারাবাহিক থেকে সিনেমা কিংবা ওয়েব সিরিজ, আউটডোর শুটের প্রয়োজন পড়ে সর্বত্রই। অভিনেতা থেকে টেকনিশিয়ান, প্রত্যেকেই যাতে নিরাপদে শুটিং করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করাও তাই জরুরি। সে দিকটা মাথায় রেখে কী কী বিষয় নিশ্চিত করতে হয় প্রযোজনা সংস্থা কিংবা পরিচালক-সহ গোটা ইউনিটকে? তারই খোঁজে সিরিয়াল ও সিনেমাপাড়ায় উঁকি দিল আজকাল ডট ইন।
জি বাংলার ধারাবাহিক ‘পরিণীতা’র পরিচালক কৃষ বসু। বহুদিন ধরেই টলিপাড়ায় কাজ করছেন তিনি। আউটডোর শুটিংয়ের সুরক্ষার নিয়মকানুন নিয়ে তিনি বলেন, “ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে যেহেতু দৈনন্দিন পর্ব থাকে, তাই এমনিতেই আউটডোর শুটের সুযোগ কম। ধরা যাক, গল্পের প্রয়োজনে জঙ্গলের দৃশ্য রয়েছে। কিন্তু জঙ্গলে শুট মানে কেউ নিশ্চয়ই এমন কোনও গভীর জঙ্গলে চলে যাবে না, যেখানে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। সিনেমা বা সিরিয়াল তো তৈরি হয় ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে। গভীর জঙ্গলের দৃশ্য দেখাতে হলে তা ঘন জঙ্গলের এলাকাতেই শুট করতে হবে, এমনটা নিশ্চয়ই নয়। খুনের দৃশ্যের জন্য কেউ তো আর সত্যি সত্যি শুট করে না। কিন্তু জঙ্গলে শুট করতে হলে সবার আগে দরকার অনুমতি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, পুলিশ সকলের অনুমতি লাগে। দুই বিভাগের লোক শুটিং ইউনিটের সঙ্গে থাকে। তারাই স্থানীয় মানুষের সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। রেকি-র সময়ে স্থানীয় সেই ব্যক্তিরাই নিরাপদ লোকেশন বাছাই করতে, ঝুঁকির দিকগুলো চিনিয়ে দিতে সহায়ক হয়ে ওঠেন। রেকি কিংবা অনুমতি নেওয়া তাই ভীষণ জরুরি আউটডোর শুটিংয়ের ক্ষেত্রে। তা হলেই বিপদের আশঙ্কা এড়ানো যায়। ‘বাঘবন্দি খেলা’ ধারাবাহিকে সুন্দরবনে শুটের সময়ে এভাবেই কাজ হয়েছিল। আমি তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। নিজে পরিচালক হিসেবে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ ধারাবাহিকের শুটে গিয়েছিলাম তাজপুরে। সেখানেও অনুমতি ছিল সব দফতরের। তাঁদের প্রতিনিধিরা, স্থানীয় মানুষ সকলেই ছিলেন শুটিংয়ে। সবাই সব জানত। যাতে সকলেই নিরাপদে শুটিং সেরে ফিরতে পারে। এই সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো করে প্রযোজনা সংস্থা বা স্থানীয় কোঅর্ডিনেটর। শুটিংয়েও ইউনিট এই নিরাপত্তার দিকগুলো খেয়াল রাখে সাধারণত। যেমন, ছুরি হাতে মারামারির দৃশ্যে ছুরিটা যেন নকল হয়। ধরা যাক, নকল ছুরি না থাকলে আসল ছুরি যদি ব্যবহার করতেও বলে কেউ, পরিচালক হিসেবেই তাতে বাধা দেওয়াটা আমার কর্তব্য। শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতা কিংবা টেকনিশিয়ন কারও ক্ষতি হওয়াটাই কাম্য নয়। তাই সুরক্ষার দিকটা নিশ্চিত করতেই হবে। ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্নই বা আসছে কেন? এটা তো পর্দার গল্প এবং শুটিং। সব দৃশ্য একেবারে পুরোপুরি দেখাতে হবে, এমনও তো নয়। ক্যামেরা, ক্রিয়েটিভিটির কাজ তো সেখানেই।”
ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নটা বহু ক্ষেত্রেই উঠে আসে, তা হল হাতে সময় কম থাকে। তাই তড়িঘড়ি শুটিং সারতে হয়। আউটডোর শ্যুটের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাতে কি অসুবিধে দেখা দিতে পারে? কৃষের দাবি, “একেবারেই তা নয়। কারণ আউটডোর শুটের ভাবনা বা পরিকল্পনা দু'টোই অনেক দিন আগে থেকে করা হয়। আর যদি দুম করে আউটডোর শ্যুটের পরিকল্পনাও হয়, সে ক্ষেত্রেও আজ সিদ্ধান্ত নিয়ে কাল বেরিয়ে পড়া হয়, এমনটা কখনওই নয়। ফলে অনুমতি নেওয়া, রেকি কিংবা লোকেশনে ব্যবস্থাপনা— সবটার জন্যই যথেষ্ট সময় হাতে থাকে। ‘পরিণীতা’র আউটডোর হয়েছিল বোলপুরে। তাতে আমরা রেকি করতেই গিয়েছি দু’বার। তারপর প্রয়োজনীয় সব অনুমতি নেওয়া হয়েছে, স্থানীয় কোঅর্ডিনেটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। যাঁরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা থেকে শুটিং- সব রকম ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করেছেন। সব রকম অনুমতি নেওয়া থাকলে পুলিশ কিংবা বিভিন্ন দফতর শুটিং ইউনিটের সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন, স্থানীয় কোঅর্ডিনেটার প্রতি মুহূর্তে গাইড করে চলবেন। সমুদ্র বা নদীর ক্ষেত্রে তারাই জোয়ার-ভাটায় জলের বিপদ কিংবা পাহাড়-জঙ্গলে ঠিক কোন জায়গাগুলোয় শুটিং করা নিরাপদ, সবটা চিনিয়ে দেবেন। তাতে তো শুট করাটাও অনেক সহজ হয়ে যায়।”
আউটডোর শুটে নিরাপত্তার দিকটায় কতটা গুরুত্ব দেয় প্রযোজনা সংস্থা? ধারাবাহিকের পাশাপাশি সিনেমাপাড়ার ছবিটাই বা ঠিক কেমন? সিরিয়াল কিংবা সিনেমা, দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করছেন রানা সরকার। তাঁর কথায়, “আউটডোর যেখানেই হোক, শহরে কিংবা বাইরে, সবার আগে জরুরি হল অনুমতি। পুলিশ তো বটেই, সঙ্গে পাহাড়, সমুদ্র বা জঙ্গল, লোকেশন অনুযায়ী নির্দিষ্ট দফতরগুলোর অনুমতি নিতেই হবে। বিশেষত সমুদ্রে শুটিং থাকলে যেহেতু কোস্টাল এরিয়ার মধ্যে পড়ে, তাই সেই নির্দিষ্ট সৈকত কোন থানা বা কোন কোন দফতরের অধীনে, সেগুলো জেনে অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতিরই অঙ্গ কিছু ব্যবস্থাপনা। যেমন লাইফ সেভিং গার্ড বা নুলিয়াদের রাখা, বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের বোট রাখা, স্থানীয় লোকজনদের পরামর্শ নেওয়া, অ্যাম্বুল্যান্স বা ফার্স্ট এডের ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি। অনুমতি নেওয়া থাকলে শুটিং লোকেশনে সমুদ্রের কোনও বিপজ্জনক অংশ প্রশাসনই নেটিং করে দেয়, যাতে কেউ সেখানে যেতে না পারে। এছাড়া নিরাপত্তার দিকটা নিশ্চিত করতে পুলিশ, নুলিয়া বা বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রতিনিধিরাও থাকেন ইউনিটের সঙ্গে, যাতে বিপদ এড়িয়ে কাজ করা যায়। কিছু জায়গা আছে, যেগুলোতে চাইলেও শুটের অনুমতি মেলে না। যেমন ‘লহ গৌরাঙ্গের নাম রে’র শুটের জন্য আমরা একটা কিছু নির্জন বিচ লোকেশন বাছাই করেছিলাম। সেখানে গভীর সমুদ্র এবং স্রোতের ঝুঁকির কারণেই অনুমতি মেলেনি। তারপর পুরী থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে একটা নিরাপদ জায়গায় শুট হয়। সিনেমার ক্ষেত্রে আমরা অন্তত দিন পনেরো আগে রেকি করে অনুমতি নিই। কারণ অনুমতি মিললে তবেই বাকি ব্যবস্থাপনা শুরু হয়। রেকি এবং সমস্ত ব্যবস্থার দিকটা খতিয়ে দেখার পরে কিছু লোকেশন বাছাই হলে প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং স্থানীয় কোঅর্ডিনেটার সমস্ত রকম অনুমতি নিয়ে আসে। সেই অনুমতি হাতে না আসা পর্যন্ত কলকাতা থেকে ইউনিট রওনাই হয় না। এছাড়াও বেশ কিছু ইনশিওরেন্সও করানো হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও এ জিনিসটা প্রযোজ্য।”
সিনেমার ক্ষেত্রে একটা বড় বাজেট থাকে। ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে ততটা থাকে না। সেই কারণে কি শুটিংয়ের নিরাপত্তার দিকটায় টান পড়তে পারে? “একদমই না,” বলছেন রানা। তাঁর কথায়, “আমি নিজেও আগে একাধিক ধারাবাহিক প্রযোজনা করেছি। স্টুডিও ফ্লোরের বাইরে শুটিং করার জন্য সব সময়েই সেই এপিসোড পিছু বাড়তি বাজেট বরাদ্দ করে চ্যানেল। সেই বাজেট আগে তৈরি করে, তার অ্যাপ্রুভাল পেলে তবেই আউটডোর শুটে যায় ইউনিট। তা ছাড়া, আউটডোরের ট্র্যাক অনুযায়ী গল্প অনেক দিন থেকেই সেদিকে গড়ায়, আউটডোরের বাজেট পেতেও সময় লাগে। তাই অন্তত মাসখানেক আগে সাধারণত আউটডোর শুট প্ল্যান হয়ে যায় ধারাবাহিকে। ফলে শুটিংয়ে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ থাকে। আর অনুমতি নেই, তবু ঝুঁকি আছে, এমন কোথাও শুট করতে যেতে হবেই বা কেন! স্রেফ খরচ কমাতে বিনা অনুমতিতে ঝুঁকিপূর্ণ শুটিং করে ফেলাটা গাফিলতিই। ফেডারেশনকেও শক্ত হাতে অনুমতির দিকটা নজরদারি করে তবেই টেকনিশিয়ন দিতে হবে।”
















