বেঁচে থাকলে এদিন তাঁর বয়স হত ৯১। তিনি, কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি নেই, পেরিয়ে গিয়েছে বেশ কয়েকটা বছর। তবু আজও সৌমিত্র সমানভাবে আলোচিত ছবি ও নাট্যপ্রেমীদের আলোচনায়। অভিনেতাদের মধ্যে তো বটেই।  আজ, এই প্রয়াত কিংবদন্তির জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করলেন পরিচালক অতনু ঘোষ।  তাঁর পরিচালনায় চারটি ফিচার ছবি এবং দু'টি টেলিফিল্মে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র। এই জুটির কাজ মানেই তা ছিল বাঙালি দর্শকের আগ্রহের বিষয়। বলাই বাহুল্য তাঁর অন্যতম এই প্রিয় পরিচালকের সঙ্গে কাজ ছাড়াও সিনেমা ও অভিনয়ের নানান দিক নিয়ে বিস্তর আড্ডা-আলোচনা করতেন সৌমিত্র। সেসব থেকে নানান টুকরো মন ভাল করা মুহূর্ত স্মৃতির ঝোলা থেকে তুলে এনে আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে ভাগ করে নিলেন 'ময়ূরাক্ষী'র ছবি খ্যাত পরিচালক অতনু ঘোষ। 

 

“বহু বছর আগের কথা। ২০০৪ সাল হবে। একটি চ্যানেলে সৌমিত্রবাবুর একটি সাক্ষাৎকারে নিয়েছিলাম যেখানে উনি মূলত ক্যা০মেরার সামনে অভিনয় নিয়ে কথা বলেছিলেন। সেই শুরু। এরপর ছবিতে অভিনয়ের আগে অভিনয়ের প্রস্তুতি, ভাবনা, প্রবণতা ইত্যাদি এই বিষয়গুলি নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হত। আমাকে একটি বই-ও উপহার দিয়েছিলেন উনি। অভিনয় নিয়ে ওঁরই একটি বক্তৃতা

 

 

 

পরবর্তী সময়ে অজস্রবার মঞ্চ ও ছবিতে অভিনয় নিয়ে ওঁর নানান ভাবনা শুনেছি। বিশেষ করে ছবিতে অভিনয়ের বিষয়টা। সত্যজিৎ রায়ের সংস্পর্শে এসে ছবির বিষয়ে ওঁর যে নানান ধ্যান-ধারণাগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল, সেগুলো নিয়ে। 

 

সৌমিত্রবাবু জানিয়েছিলেন, শিশির ভাদুড়ীর হাত ধরেই ওঁর মঞ্চে অভিনয় শুরু। 'প্রফুল্ল' নাটকে একসঙ্গে অভিনয়ও করেছিলেন তাঁরা। সুতরাং, নাটকের বিষয়ে প্রাথমিক ধ্যানধারণা ওঁর তৈরি হয় শিশির ভাদুড়ীর থেকেই। কিন্তু সেই সময় উনি চুটিয়ে হলিউডের ছবি দেখছেন আবার ভারতীয় ছবিও দেখছেন। বিশেষ করে, বলরাজ সাহানি-কে খুবই উঁচু চোখে দেখতেন সৌমিত্রবাবু। তবে ফিল্ম অ্যাক্টিংয়ের বিষয়টি ওঁর আরও স্পষ্ট হতে লাগল সত্যজিতের রায়ের সঙ্গে আলোচনা ও ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘জলসাঘর’, ও ‘পরশপাথর’ ছবির সুত্র ধরে। ওঁর মনে হয়েছিল এটাই সঠিক ফিল্মের অভিনয় যেখানে থিয়েটারের প্রভাব নেই এবং একজন অভিনেতা পুরোপুরি তাঁর অন্তরের সত্বার সূত্র ধরে তাঁর ভাব, অনুভূতি ও অভিব্যক্তি প্রকাশ করছে। আর বলতেন, ‘অভিনেতার যে শৈলী বা ক্রাফ্ট তা সবসময় লুকিয়ে রাখতে হবে ক্যামেরার কাছ থেকে।  কারণ যেই মুহূর্তে এই প্রক্রিয়াটা ধরা পড়ে যাবে, অমনি সত্য বা ট্রুথ নষ্ট হবে। যে কোনও শটে অভিনেতার প্রয়োগ কৌশল ধরা পড়লেই সর্বনাশ!’ 

 

‘ময়ূরাক্ষী’ ছবিতে ওঁর একটি ঘুম ভাঙার দৃশ্য ছিল। জিজ্ঞেস করলেন ক্যামেরার লেন্স কত? বললাম, পঞ্চাশ মিলিমিটার। শোনামাত্রই বলে উঠলেন, ‘ওরে বাবা, এত কাছাকাছি!’ এবার জানতে চাইলেন, আমি কী এক্সপেক্ট করছি ওঁর থেকে। ঘুম ভাঙার ধাপগুলো অত বড় ম্যাগনিফিকেশনে কী করে বিশ্বাসযোগ্য করা যায়?  কী কী করতে পারেন এবার বলতে শুরু করলেন। প্রথমে ডান চোখের কোণটা একটু কাঁপল, সামান্য ঢোক গিলে তারপর হয়তো ঠোঁটটা সামান্য খুলল, ইত্যাদি। এরকম পরপর ‘ইভেন্ট’ বলে যাচ্ছেন।  মুখ, চোখ, শরীরের নানান পেশীর ওপর কতখানি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকলে একজন অভিনেতা এভাবে তালিকা তৈরি করতে পারেন!  উনি কিন্তু পরপর এই 'ইভেন্ট'গুলো দেখিয়ে যাচ্ছেন আর ভেবে নিচ্ছে এগুলো কীভাবে করতে পারবেন ওই দৃশ্যে। আমি দেখেটেখে বলেছি কোনগুলো চাই আর চাই না। এরপর অবাক কান্ড! প্রত্যেকটা মেকানিক্যাল ধাপকে একেবারে সহজ,  স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্যামেরার সামনে অসম্ভব মসৃণ করে নিলেন। যেন কোথাও কোনও ক্রাফ্ট নেই, সবটাই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ন্যাচারাল রেসপন্স!

 

 

 

আর একটা কথা উনি বারবার বলতেন, যা নতুন প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বলেই আমার বিশ্বাস। থিয়েটার বা মঞ্চে একজন অভিনেতা জানেন, নাটকের শুরু থেকে শেষ অবধি তাঁর অভিনয় কিভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছবে। দিনের পর দিন মহড়া দিয়ে ঘষামাজা করে তা ঠিক করা হয়েছে। তাছাড়া স্টেজে অভিনেতা ও দর্শকের মাঝে আর কিছু নেই। কিন্তু ছবিতে ব্যাপারটা আলাদা। কারণ মাঝে রয়েছে ক্যামেরা। আর কীভাবে সেই যন্ত্র ব্যবহার করা হবে, সেটা ঠিক করছেন পরিচালক। তিনি কোন পরিকল্পনার ভিত্তিতে নানান শট নিচ্ছেন সেটা অভিনেতা জানেন না। আবার শুটিংয়ে তোলা বিভিন্ন শট সম্পাদনার পর শেষমেশ ছবিতে কিভাবে সাজানো হবে সেটাও অভিনেতার জানার উপায় নেই। কাজেই পরিচালক হিসেবে তুমি যদি প্রতি মুহূর্তে আমায় সঠিকভাবে গাইড না করো, শক্ত করে আমার হাতটা না ধরে থাকো, আমার কাজটা মোটেই সহজ হবে না। অর্থাৎ, যে সব পরিচালকদের  অভিনয় সম্পর্কে আগ্রহ আছে, উৎসাহ আছে, ফিল্মের অভিনয়ের প্রয়োগ, রীতি, কৌশল সম্পর্কে সঠিক ধারনা আছে, তাঁদের ছবিতে আমার অভিনয়ের খোলতাই হবে বেশি, এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই।”

 

 

ফিল্ম অ্যাক্টিংয়েরর আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ- ডাবিং! অসম্ভব গুরুত্ব দিতেন ডাবিং বিষয়টিকে। বলতেন “দ্যাখো, ধাপে ধাপে তোমার ছবি বদলেছে। প্রথমে চিত্রনাট্যে ভাবনাটা ছিল একরকম, তারপর শুটিং করতে গিয়ে কিছুটা অবশ্যই পাল্টেছে, তারপর সম্পাদনায় আরও কিছুটা...এই প্রতিটি  ধাপের বদল পেরিয়ে যে জিনিসটা তৈরি হল, তাকে মসৃণভাবে জুড়ে রাখতে পারে ডাবিং। কারণ তোমার কন্ঠ এক ধরনের সেতু তৈরি করছে।” সৌমিত্র চট্টেপাধ্যাখয়ের ডাবিং করার পদ্ধতি ছিল অভিনব। প্রথম সেই দৃশ্যের সংলাপগুলো নিজের হাতে কাগজে লিখে নিতেন। সংলাপের যেখানে যতটা ‘পজ’, সেখানে ছোট-বড় দাঁড়ি দিতেন। এবার যখন মাইকে ডাবিং করতে শুরু করলেন, স্ক্রিনের দিকে বিশেষ তাকাতেন না। স্রেফ কানের হেডফোনে গাইড ট্র্যাকটা শুনে নিজের সংলাপগুলো বলে যেতেন! আর সেগুলো ঠোঁটের সঙ্গে নিঁখুত মিলে যেত, মানে টেকনিক্যাল পরিভাষায় ‘সিঙ্ক’ করে যেত। 

 

শেষ করব সৌমিত্রবাবুর আরও একটি ‘বক্তব্য’ দিয়ে, যা আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। উনি বলতেন, “এত কিছুর পরেও সিনেমার অভিনেতাকে  মনে রাখতে হবে, প্রত্যেেক পরিচালক, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক সবাই কিন্তু  অভিনয়ের মান আরও উন্নত, পরিণত করতে চাইছে। কাজেই তারা অভিনয় শিল্পের বিকাশে কখনই অন্তরায় নন, বরং পরিপূরক বলা চলে। গোড়াতেই এই সার সত্যিটুকু বুঝে গেল ফিল্ম অ্যাক্টর অনেক দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংশয় থেকে মুক্ত হতে পারেন।”