১৯৪৫ থেকে ১৯৫৩—ভারতীয় উপমহাদেশের এক অস্থির ও যুগান্তকারী সময়কে কেন্দ্র করে নির্মিত "শ্যামা" শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের চিত্রায়ণ৷ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর জীবন, আদর্শ ও আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রাণিত এই চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে দেশভাগ, জাতীয় ঐক্যের সংগ্রাম, বাংলার ভবিষ্যৎ এবং এক নতুন ভারতের নির্মাণের কাহিনি।

'শ্যামা' নামটি গভীর তাৎপর্য বহন করছে। এটি যেমন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামকে স্মরণ করায়, তেমনি সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা মাতৃভূমির প্রতীক হিসেবেও শ্যামা নামটি সাহসী, চিরন্তন এবং অবিনশ্বর ভারতমাতৃকার অন্তরাত্মার ছবি৷ 

এই চলচ্চিত্রে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যাঁর প্রচেষ্টায় দেশভাগের সময় বিশেষভাবে স্মরণীয়৷  পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আন্দোলনে যে ব্যক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

 পাশাপাশি, দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে হিন্দু বাঙালিদের জন্য নিরাপদ মাতৃভূমির দাবিতে তাঁর অবস্থানকেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে। উপমহাদেশের ইতিহাসের এক অন্ধকারতম সময়ে বহু মানুষের কাছে তিনি হিন্দু বাঙালিদের রক্ষাকর্তা হিসেবে স্মরণীয়।

চলচ্চিত্রটি এমন এক রাষ্ট্রনায়কের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে, যিনি নিজের আদর্শে অটল ছিলেন, উদ্বাস্তু ও বাস্তুচ্যুত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, ভারত এক সংবিধান ও এক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই ঐক্যবদ্ধ থাকবে। তাঁর ঐতিহাসিক আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক— "এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান, দুই নিশান—চলবে না।"

'শ্যামা' কেবল একটি জীবনীচিত্র নয়; এটি আদর্শ, সাহস, আত্মত্যাগ এবং ভারতের ইতিহাসের এক নির্ধারক অধ্যায়ের প্রতি এক আন্তরিক শ্রদ্ধা। এক মানুষ। এক দর্শন। এক মাতৃভূমি। এক অবিস্মরণীয় উত্তরাধিকার।

এই ছবির প্রসঙ্গে বিধায়ক তরুণজ্যোতি তিওয়ারি বলেন, "আমি 'শ্যামা' ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, কারণ ইতিহাসকে আজকের প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। আমরা যদি নিজেদের অতীতকে না জানি, তাহলে ভবিষ্যৎ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। এই চলচ্চিত্রটি এমন এক অনুপ্রেরণাদায়ক কাহিনি তুলে ধরে, যা জেন জেড এবং জেন আলফা-র সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারে। আর সেই কারণেই ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ। কিংবদন্তিদের মূল্যায়ন হয় তাঁদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় মাত্র ৫১ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাঁর সাহস, আদর্শ এবং ভারতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এমন এক উত্তরাধিকার তৈরি করেছে, যা চিরকাল ভাস্বর থাকবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, নিজের সর্বোচ্চটা দেশের জন্য উৎসর্গ করা উচিত। ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতার জন্য তিনি তাঁর সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি শুধু ইতিহাস রেখে যাননি, তিনি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন একটি লক্ষ্য, একটি আদর্শ এবং দেশকে রক্ষার জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প। একজন প্রকৃত যোদ্ধা কখনও মৃত্যুবরণ করেন না। তাঁর আদর্শ যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখিয়ে যায়। হিন্দু বাঙালির মাতৃভূমির স্রষ্টাকে জানাই শ্রদ্ধা জানাতেই এই ছবির সঙ্গে আমার যুক্ত হওয়া৷ "

এই ছবি প্রসঙ্গে পরিচালক সুচন্দ্রা এক্স ভানিয়া এবং চন্দ্রোদয় পাল বলেন, "ইতিহাস শুধু কিছু তারিখ বা ঘটনাপঞ্জি নয়; ইতিহাস তাঁদের গল্প, যাঁরা আরামের চেয়ে আদর্শকে বেছে নিয়েছিলেন। "শ্যামা" নির্মাণের মাধ্যমে আমাদের উদ্দেশ্য সেইরকমই এক জীবনযাত্রার চলচ্চিত্ররূপ তুলে ধরা, যা দর্শকদের ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে।" 

 "শ্যামা" যেমন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম নাম, তেমনি এটি মা কালীরও নাম, যিনি কলকাতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিতা। এই দ্বৈত অর্থই চলচ্চিত্রটির আবেগের কেন্দ্রবিন্দু—একদিকে শ্যামার আশীর্বাদে রক্ষিত এক শহর, অন্যদিকে সেই শহরেরই এক সন্তান, যিনি একই নাম বহন করে ইতিহাসের এক সঙ্কটময় সময়ে নিজের পথ নির্মাণ করেছিলেন।" সংযোজন পরিচালকের৷ 

পরিচালক বলেন, "বৃহৎ ক্যানভাসের দৃশ্যায়ন এবং গভীর মানবিক গল্পের মাধ্যমে আমরা তুলে ধরতে চাই ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র বিভীষিকা, উদ্বাস্তু মানুষের অসহনীয় যন্ত্রণা এবং সেই সময়কার আদর্শগত সংঘাত, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। ইতিহাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও, "শ্যামা" মূলত অতীতকে সিনেমার ভাষায় নতুনভাবে উপলব্ধি করার এক প্রয়াস—যা দর্শকদের ভাবতে, আলোচনা করতে এবং সহমর্মিতার সঙ্গে ইতিহাসকে অনুভব করতে আহ্বান জানায়। 'শ্যামা' আমাদের পক্ষ থেকে দৃঢ়তা, আদর্শ এবং এক অমর সভ্যতার চেতনার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাঞ্জলি।"