শিশুদের এক আনন্দের ঘরের (চিল্ড্রেনস্ লিটিল থিয়েটার) পঁচাত্তর বছরের উদ্‌যাপন শুরু হতে চলেছে আগামী ৮ মে, ২০২৬ থেকে। নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্‌যাপন করা হবে এই বছরটি।

কলকাতার ঢাকুরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত অবন মহল চিল্ড্রেনস্ লিটিল থিয়েটারের বর্তমান ঠিকানা। তবে এর সূত্রপাত হয় ১৯৪৯ সালে, যখন চেতলা হাই স্কুলে দক্ষিণ কলকাতা জেলা স্কাউটসের এক সমাবেশে স্কাউটার সমর চ্যাটার্জীর লেখা কয়েকটি ছড়া ছোটরা পরিবেশন করে। তাদের পরিবেশনা এতটাই চিত্তাকর্ষক ছিল যে অনুষ্ঠানের সভাপতি ডঃ কালিদাস নাগ শ্রী চ্যাটার্জীর ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন, “আমাদের দেশে কোনও শিশু থিয়েটার নেই। এমন একটি দল তৈরি করছেন না কেন?” সেই থেকে এই ভাবনাটি ১৯৫১ সাল পর্যন্ত শ্রী সমর চ্যাটার্জীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, তারপর এটি ‘রিদম্‌স অ্যান্ড রাইমস’ নামে একটি সংগঠনের আকার নেয়। এই খবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর কাছে পৌঁছালে তিনি একটি মূল্যবান বার্তার মাধ্যমে তাঁর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। বলেন, “আমি আনন্দিত যে কলকাতায় শিশুদের একটি লিটল থিয়েটার গঠন করা হয়েছে। আমি এর সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করি এবং আশা করি এটি শিশুদের আনন্দ দেবে। একই সঙ্গে সম্ভবত বড়দের উপলব্ধি করাবে যে একটি শিশুর মধ্যেও কতটা প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে।”

শ্রী এন. এন. বসুর উৎসাহে এবং দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় অনুপ্রাণিত হয়ে, ১৯৫২ সালের ১১ই মে নিউ এম্পায়ার মঞ্চে প্রথমবার সর্বজনীন প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। অনেক নামকরা বিদ্যালয় তাদের সক্রিয় সমর্থন জানায়। প্রদর্শনীর আগে, প্রখ্যাত লেখক ও পরিচালক সত্যজিৎ রায় সেন্ট জনস ডায়সেশনস স্কুলে অনুষ্ঠিত একটি মহড়ায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর শিল্পী, তাই তিনি যা দেখছিলেন সেই মজাদার কার্যকলাপের প্রতিফলন ঘটিয়ে নাটকের অংশ হিসেবে তলোয়ার ও ঢাল হাতে একটি শিশুর দ্রুত একটি খসড়া স্কেচ এঁকে ফেলেন। এটি কেবল একটি আশীর্বাদই ছিল না, বরং পরবর্তীকালে এটিকে প্রতিষ্ঠানটির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৫২ সালের ৭ই জুলাই, সংস্থাটির নাম পরিবর্তন করে ‘চিল্ড্রেনস লিটল থিয়েটার’, অর্থাৎ সিএলটি বা ‘শিশু রঙ্গমহল’ রাখা হয় এবং ১৯৫২ সালের ১৬ই অক্টোবর এটি যথাযথভাবে নিবন্ধিত হয়।

 শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি ছড়া, সঙ্গীত, নৃত্য, অঙ্কন, টেবিল টেনিস এবং শিশুদের আগ্রহের অন্যান্য আনুষঙ্গিক মাধ্যম যুক্ত করার জন্য সিএলটি স্কুল, বিশেষ করে নার্সারি ও জুনিয়র বিভাগ এবং অন্যান্য শিশু সংগঠনের সাথে তাদের কার্যক্রম যুক্ত করে। 

পরে কয়েক লক্ষ টাকা ব্যয় করে নির্মিত ক্যাম্পাসটির নামকরণ বিখ্যাত লেখক-শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে করা হয়েছিল ‘অবন মহল’। সিএলটি শুধু নাচ বা নাটকের একটি বিদ্যালয় নয়— এটি ভারত এবং পাশ্চাত্যে শিশুদের নাট্য প্রদর্শনীর এক অগ্রদূত। এটি শিশুদের মধ্যে উদ্ভাবনী ক্ষমতা, আত্মসংযম, মানসিক সতর্কতা এবং ব্যক্তিত্বের মতো গুণাবলীকে বিকশিত করতে সাহায্য করে। 

সিএলটি লোককথা ও উপকথা—যেমন 'রামায়ণ', 'আন্ডার দ্য সি' (Under the Sea), 'সাত ভাই চম্পা'—থেকে নেওয়া চমৎকার সব রূপান্তরের মঞ্চায়ন বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি 'মিথুয়া' এবং 'অবন পটুয়া'-র মতো মৌলিক নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করাতেও তারা সমান উৎসাহী। কেবল পণ্ডিত নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, ড. বিধানচন্দ্র রায়, মোরারজি দেশাই-এর মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাই যে সিএটি-এর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন তা নয়; রবিশঙ্কর ও তিমির বরণের মতো প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীরাও এই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা যথাক্রমে সিএলটি-এর বিখ্যাত প্রযোজনা 'ছেলেটা' এবং 'রামায়ণ'-এর আবহ সঙ্গীত রচনা করেছিলেন। শিক্ষার্থীরা বালকৃষ্ণ মেনন, কলাবতী দেবীর মতো প্রথম সারির শিক্ষকমণ্ডলীর অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল; তাদের মধ্যে অনেকেই কলকাতায় সিএলটি-এর মাধ্যমেই তাদের পেশাগত জীবনের সূচনা করেছিল পরর্বতীতে। ১৯৬৪ সালে সিএলটি 'চিলড্রেনস কমনওয়েলথ প্রোগ্রাম'-এ অংশগ্রহণ করে এবং ইউরোপের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রেক্ষাগৃহে তাদের পরিবেশনা উপস্থাপন করে; যার সমস্ত আয়োজন স্বয়ং পণ্ডিত নেহরু করেছিলেন।

 প্রখ্যাত অভিনেত্রী এবং সিএলটি-এর প্রথম ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রী শর্মিলা ঠাকুর মন্তব্য করেছেন, “আমার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই যে, শৈশবের এই অভিজ্ঞতা এবং নাট্য জগতের বহুমুখী সংস্পর্শই সৃজনশীল জগতের প্রতি আমার অনুরাগ গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে এবং আমার নির্বাচিত পেশার জন্য আমাকে প্রস্তুত করে তুলেছে।” এই বছর, ৮ই মে তারিখটি সিএলটি-এর ৭৫তম প্রতিষ্ঠা দিবস । সেই কারণেই বছরব্যাপী 'হীরক জয়ন্তী' বর্ষ উদযাপনের এক চমৎকার সূচনা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। ৮ই মে ২০২৬ থেকে ৮ই মে ২০২৭-এর মধ্যবর্তী সময় দু'টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্‌যাপন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে— 'প্রতিষ্ঠাতা দিবস' (Founder’s Day), যা ১৯ শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পালিত হবে; এবং 'ডিসেম্বর উৎসব' বা বার্ষিক অনুষ্ঠান, যা ১৮ই থেকে ২১শে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।  এক সময় দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা সিএলটি-এর কিছু কালজয়ী প্রযোজনাকে পুনরায় মঞ্চস্থ করারও পরিকল্পনা রয়েছে। 

৮ই মে ২০২৬ তারিখে আমাদের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা দিবসের ক্ষণটি আমরা আপনাদের আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে—প্রাক্তন সংস্কৃতি মন্ত্রী জওহর সরকার, প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব সৌমিত্র বসু, সমাজ সংস্কারক ও নৃত্যশিল্পী অলোকানন্দা রায় এবং অভিনেতা ও বিধায়ক চিরঞ্জিত চক্রবর্তী-র মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা সেই সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠানে তাঁদের উপস্থিতিতে আমাদের ধন্য করবেন।   শিক্ষার্থীদের পরিবেশনার তালিকায় থাকবে একটি উদ্বোধনী সমবেত সঙ্গীত, কড়ির ছন্দে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা, রোলার স্কেটিং, আবৃত্তি এবং উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর রচিত নাটক—‘জোলা আর সাত ভূত’। জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত ‘আনন্দ’-এর মধ্য দিয়ে এই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে। এটি রবীন্দ্রনাথের গানের একটি সংকলন, যা প্রিয়লাল চৌধুরীর সুরারোপিত এক শ্রুতিমধুর আবহ সঙ্গীতের সুতোয় গাঁথা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষে ১৯৬১ সালে ‘আনন্দ’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল।

এই আনন্দঘন মুহূর্তে, সিএলটি-এর সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর মুখার্জি সকলকে আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, "শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর এই আন্দোলনকে নিরবচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে অঙ্গীকার আমাদের রয়েছে তাতে শামিল হতে বলি।"