পূর্ব বর্ধমানের মেমরি ব্লকের ছোট্ট একটি গ্রাম দেবীপুর। ছোট্ট হলেও বর্ধিষ্ণু। এই গ্রামের-ই ভূমিকন্যা ডঃ ইন্দুদীপা সিনহা। পেশায় চিকিৎসক হলেও নেশায় তিনি একজন পুরোদস্তুর নাট্যকর্মী। ইতিমধ্যেই তাঁর নির্দেশনায় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে দর্শকরা দেখে ফেলেছেন একাধিক মঞ্চসফল নাটক। দেবীপুরে ইন্দুদীপার একটি মান্থলি ফ্রি ক্লিনিক রয়েছে। ফি মাসে একবার সেখানে গ্রামবাসীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করানোর পাশাপাশি সময় সুযোগ পেলেই তাঁদের নিয়েই নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে ওঠেন। মূলত, শহর এবং গ্রামের মানুষদের শৈল্পিক মেলবন্ধনের প্রচেষ্টাতেই এই পরিকল্পনা।

 

 

আর এই বিষয়ে চিকিৎসক-নাট্যকর্মীর প্রধান সঙ্গী তাঁর মা দীপ্তি সোম সিনহা। এই গ্রামে দোল দুর্গোৎসবের প্রচলন থাকলেও এখন তার সঙ্গে জুড়েছে  সরস্বতী পুজো। আরও ভাল করে বললে, তা দেবীপুর গ্রামের একমাত্র পারিবারিক উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন পারিবারিক? 

কারণ ইন্দুদীপার ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো বাড়ির ঠিক পাশেই রয়েছে তাঁদের ১৮০ বছরের একটি মন্দির। সেই মন্দির প্রাঙ্গনেই এই উৎসবে যোগ দেন গ্রামের সকল বাসিন্দা। ২০২০ সালে সরস্বতী পুজো উপলক্ষে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি শুরু করেছিলেন ইন্দুদীপা। কেন করেছিলেন হঠাৎ এই প্রচেষ্টা? তাঁর কথায়, “আমার গ্রামের মানুষেরা কখনও সেভাবে শিল্প-সাংস্কৃতিক উৎসবের সঙ্গে তাঁরা  পরিচিত ছিলেন না। এখানে শিল্প উদযাপন মানে ছিল মাইক বাজিয়ে একটু নাচানাচি করে নিল। আবার কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে নাচ-গান শেখে। একসঙ্গে মিলে উদযাপনের ব্যাপারটা ছিল না। এরপর আস্তে আস্তে প্রতি বছর এই উৎসবের পরিধি একটু একটু করে বাড়তে লাগল। দেবীপুর গ্রামের মানুষদের পাশাপাশি কলকাতা ও তার আশেপাশে উপকণ্ঠের নানান অঞ্চল থেকে শিল্পী, নাটকের দল সে পারফর্ম করা শুরু করলেন। ইন্ডিভিজ্যুয়াল পারফর্মিং আর্টের শিল্পীরা এসেছেন। তাঁরা দেবীপুর গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে মিলেমিশে পারফর্ম করেছেন, এমন উদাহরণও রয়েছে। 

বলাই বাহুল্য, এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান একসঙ্গে উদযাপনের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে আমার গ্রামের বাসিন্দাদেরও। কারণ নাটক দেখার অভিজ্ঞতা এঁদের কারওই ছিল না। তাই 'লাইভ নাটক' বিষয়টি কী সেটা তাঁরা প্রথমে এখানেই দেখেছে। পাশাপাশি শহরের মানুষেরা কীভাবে শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তারও আঁচ দেবীপুরের গ্রামবাসীরা পেয়েছে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি, শহর তো অনেক দূরের এবং অনেক বড় ব্যাপার এঁদের কাছে, তাই ওখানকার মানুষেরা তাঁদের পারফর্মিং আর্ট দেখে তারিফ করছে, আলোচনা করছে...এই ব্যাপারটা তাঁদের কাছে ভীষণ ভাল লাগার একটি বিষয়। সব মিলিয়ে আমাদের সরস্বতী পুজো উপলক্ষে এই উৎসব এখন গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন একটা ব্যাপার বলা যেতে পারে। এখন আমার গ্রামের মানুষ অনেক বেশি কনফিডেন্ট। শিল্প সাংস্কৃতিক উৎসব সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ও ভালবাসা আজ আরও পোক্ত।” হাসতে হাসতে দৃপ্ত গলায় মন্তব্য ইন্দুদীপার। 

 

এবারে এই অনুষ্ঠানের জৌলুস যে বেড়েছে আরও খানিকটা, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। টেনথ প্ল্যানেট প্রযোজিত, শরণ্য দে-র নির্দেশনায় ‘একটি বন্ধ পোস্টঅফিস’ নাটকটি সরস্বতী পুজোর সন্ধ্যায় এখানে মঞ্চস্থ হবে। পাশাপাশি নৃত্যানুষ্ঠানের সঙ্গে এইবারের অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় চমক হিসেবে রয়েছে পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত ঢাকি গোকুল চন্দ্র দাসের অনুষ্ঠান। অবশ্য তিনি একা থাকবেন না। তাঁকে সঙ্গ দেবেন তাঁর মহিলা ঢাকির দল! এবং এর সঙ্গে দেবীপুরের বাসিন্দাদের পারফরম্যান্স তো আছেই। চিত্রগ্রাহক শুভাশিস মল্লিক- এই অনুষ্ঠানের মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব সামলেছেন।  সব মিলিয়ে এই বাণীবন্দনা উৎসব উদযাপনের তালিকা কিন্তু বেশ জমজমাট!

আরও একটি কথা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন। দেবীপুরের মানুষেরা কিন্তু তাঁদের গ্রামের মেয়ের পাশেও দাঁড়িয়েছেন। নিজেই সেকথা আজকাল ডট ইন-কে জানিয়েছেন ইন্দুদীপা।  ওঁর পরিচালিত নাটক ‘এমন মানবজমিন’ প্রযোজনার নেপথ্যে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান না থাকলেও  ছিলেন দেবীপুরের বসবাসকারী বাসিন্দারা।