ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ঘরানায় নতুন বাংলা সিরিজ। কেমন হল কাটাকুটি ২? লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষের মন বড় কঠিন ঠাঁই। কখন কোন ঘটনা যে তাতে রেখাপাত করে, কীভাবে করে, তা বলা মুশকিল। মনস্তত্ত্বের সেই দোলাচল একটা মানুষকে যেমন আলোর দিকে, ভালর দিকে নিয়ে যেতে পারে, তেমনই ঠেলে দিতে পারে অন্ধকারে ঠাসা খারাপের দিকেও। আর কেউ যদি একবার সেঁধিয়ে যায় সেই আঁধারে, চোরাবালির মতো তাকে গিলে খাবেই অপরাধের দুনিয়া।
ছোটবেলায় কোনও নিগ্রহের শিকার হলে, সে শারীরিক হোক বা মানসিক কিংবা যৌন নিগ্রহ, তার ছায়া তাই আমূল পাল্টে দিতে পারে একটা মানুষকে, বরাবরের মতো বদলে দিতে পারে তার জীবনের গতিপথ। মনের অতলে বাস করা সেই নিকষ কালো স্মৃতি কেমন করে ভবিষ্যতের অপরাধমনস্কতার জন্ম দেয়, সে কাহিনিই তুলে ধরেছে ‘কাটাকুটি ২’। ক্লিক প্ল্যাটফর্মের নতুন ওয়েব সিরিজ। ডার্ক সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ইদানীং ওটিটি দর্শকের বেশ পছন্দের ঘরানা। ফলে এ ধরনের সিরিজে প্রত্যাশা মেটানোর একটা চাপ থাকেই। অগোছালো এডিটিং, আবহ এবং কিছু ছোটখাটো ভুল বাদ দিলে সেই প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা সফল ভাবেই ধরা দিয়েছে ‘কাটাকুটি ২’-র পাঁচ পর্বের কাহিনি জুড়ে।
গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, এক স্কুলছাত্রীকে খুনের দায়ে সাত বছর জেল খাটার পরে কোনও রকম প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাস পাচ্ছে স্কুলবাসের ড্রাইভার সমীর মণ্ডল (সুব্রত দত্ত)। কিন্তু ততদিনে তার জীবনটাই ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। তার স্ত্রী সুষমা (জয়তী চক্রবর্তী) এখন সমীরেরই বন্ধু অশোকের (শুভ্রজিৎ দত্ত) স্ত্রী। একমাত্র মেয়ে তুলিও (শ্রী ভট্টাচার্য) অশোককেই বাবার জায়গা দিয়েছে। নিরপরাধ হিসেবে ছাড়া পেলেও সমাজের চোখে খুনি হয়েই থেকে যায় সমীর। তার চেনা জগতও তাকে ব্রাত্য করেই রাখে। একলা হয়ে পড়া সমীরের পাশে থাকে শুধু তার একদা প্রতিবেশী, পাতানো বোন রাকা (অমৃতা চট্টোপাধ্যায়)। পেশায় সাংবাদিক রাকা পণ করে, যেমন করেই হোক সে তার সমুদাকে ফিরিয়ে দেবে তার হারানো সম্মান। কিন্তু তার জন্য আসল খুনিদের খুঁজে পেতে হবে। এ কাজে রাকা পাশে পায় তার সহকর্মী টিনটিনকে (পূষণ দাশগুপ্ত)। তারা জানতে পারে, স্কুলছাত্রী নন্দিনীর মতো ঠিক একই ভাবে আরও এক কিশোরী খুন হয়েছে অতীতে। এদিকে ছবি আঁকায় অসম্ভব পারদর্শী তুলি মন দিয়ে ফেলেছে তার আঁকার স্যর ধ্রুবকে (শাওন চক্রবর্তী), যার অতীত তাকে তাড়া করে বেড়ায় সর্বক্ষণ। কে আছে এই পরপর খুনের নেপথ্যে? কেনই বা সে এভাবে খুন করছে অল্পবয়সী মেয়েদের? তুলির ভালবাসায় কি ধরা দেবে ধ্রুব? কী আছে তার অতীতে? উত্তর পেতে হলে সিরিজটা দেখতে হবে।
মনস্তত্ত্বের জটিল কাটাকুটি মানুষকে কোন চোরাবালিতে ঠেলে দিতে পারে, তাতে আয়না ধরাটা নিঃসন্দেহে ভাল প্রচেষ্টা বলাই যায়। এই ঘরানায় ইদানীং সিরিজের সংখ্যা বাড়ছে টলিউড-বলিউড সর্বত্র। তার মধ্যেও বেশ কিছুটা অন্য স্বাদের গল্প বুনেছে রম্বস। তাকে যথাসম্ভব যত্নে পর্দায় তুলে এনেছেন পরিচালক রাজা চন্দ এবং চিত্রনাট্যকার রুদ্রদীপ চন্দ। ডার্ক সাইকোলজির আঁধারে বোনা এ সিরিজে একের পর এক পরত সরিয়ে সত্যিতে পৌঁছনোর সফরটাকে তাই বিশ্বাসযোগ্য লাগে। তবে হ্যাঁ, অগোছালো এডিটিংয়ে টাইমলাইনের দোলাচল খানিকটা বিসদৃশ ঠেকে বটে। তা ছাড়া বেশ কিছু জায়গায় কিছু দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, সেগুলো না থাকলে বরং আরও একটু টানটান হতে পারত এ কাহিনি। থ্রিলার বোনার সুতোটা আসলে শক্ত হাতে ধরা জরুরি। এ ছাড়া, কোথাও কোথাও বেমানান লেগেছে আবহসঙ্গীতও।
অভিনয়ের খাতায় বরং বেশি নম্বর পাবে ‘কাটাকুটি ২’। কিছু না করেই অপরাধী হয়ে পড়া সমীরকে যত্নে গড়েছেন সুব্রত। সিরিয়াস সাংবাদিক, সত্যসন্ধানী রাকা হিসেবে অমৃতাকে ভাল লাগে। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন টিনটিনরূপী পূষণও। কিশোরী তুলির প্রেম, যন্ত্রণা, বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি সবটাকেই সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন শ্রী। তার বাবা-মা হিসেবে জয়তী এবং শুভ্রজিৎকেও বেশ লাগে। মিডিয়া অফিসের টক্সিক এবং মেল শভিনিস্ট বসের চরিত্রে চোখ টেনেছেন রানা বসু ঠাকুর। তবে এ সিরিজের প্রাপ্তি বলাই যায় শাওনকে। ধ্রুবর মনের দোলাচল, অতীতের টানাপোড়েন সবটাই তিনি নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তোলেন।
যদিও একটা বিষয় ভাবার মতো। তুলি এবং তার প্রাণের বন্ধু— টিনএজার দুই স্কুলছাত্রীর কথোপকথনের বিষয় বা সংলাপ যদি শুধুমাত্র যৌনতা ঘিরেই আবর্তিত হয়, তবে তা বোধহয় খানিকটা ভুল বার্তা দেয়। আর সেই সব সংলাপে ভুল ইংরেজির ব্যবহারও বেশ কানে লাগে। এদিকটায় নজর বোধহয় কিছুটা কম পড়ে গিয়েছে।
















