কলেজবেলার হাসিকান্নায় চেনা দুঃখ, চেনা সুখ। ‘হ্যায় জুনুন’ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত। 

 

হেরো মানুষদের জিতে যাওয়ায় একটা আলাদা ভাললাগা থাকে। সেই তিরতিরে সুখ মন পেরিয়ে বুকের ভিতর সেঁধিয়ে যায় নিমেষে। আন্ডারডগদের গল্প তাই বরাবরই হাততালি কুড়িয়েছে পর্দায়। ছুঁয়ে গিয়েছে দর্শকমনের অলিগলি। আর তা যদি হয় তারুণ্যের আবেগে মোড়া, তবে তো কথাই নেই! 

 

 

 

ছাত্রজীবনের হারজিত, মিঠে প্রেম-বিরহে নব্বইয়ের দশকে ঠিক যেভাবে মন কেড়েছিল ‘যো জিতা ওহি সিকন্দর’। দশকের পর দশক তাই তার আকর্ষণও অটুট। আরবসাগরের জল তারপর ঢেউ তুলেছে একের পর এক প্রজন্মে। কখনও কলেজ, কখনও স্কুলের গল্পে। সেই তালিকাতেই নাম লেখাতে চাইল হালফিলের ‘হ্যায় জুনুন – ড্রিম, ডেয়ার, ডমিনেট’। জিও হটস্টারের নতুন সিরিজ। সঙ্গে ছুঁতে চাইল আরও একটা সাফল্যের ছক। নাচ-গানের প্রতিযোগিতার টানটান উত্তেজনায় ধরতে চাইল হিট সিরিজ ‘বন্দিশ ব্যান্ডিটস’-এর চেনা সমীকরণ। 

 

 

 

গল্পের কেন্দ্রে মুম্বইয়ের অ্যান্ডারসন কলেজ। তার আইকনিক গানের ব্যান্ড সুপারসনিক ধারাবাহিক ভাবে জিতে আসছে জনপ্রিয় ট্যালেন্ট কম্পিটিশন ‘গোট (GOAT)’। প্রতি ব্যাচে বিত্তশালী পরিবারের ছেলেমেয়েরাই বরাবর এই দলের অংশ হয়ে এসেছে, যাদের জীবনে সমস্যা বলে কিছু নেই। গানকেও তারা সহজভাবেই নেয়। এ বছরও যে সুপারসনিকই চ্যাম্পিয়ন হবে, তাতে সন্দেহ নেই কারও। তার মধ্যেই গরিব ঘরের ছেলে সুভাষ মাত্রে ওরফে স্যাবি-র (সুমেধ মুদগলকর) নেতৃত্বে মাথাচাড়া দিতে চায় কলেজের অনামী নাচের দল মিসফিটস। এ দলটায় একগাদা হেরে যাওয়া মানুষের ভিড়। কেউ হেরেছে দারিদ্র্যের কাছে, কেউ জীবনের কাছে, কেউ সমাজের চোখে ‘ব্রাত্য’, কেউ বা না-পাওয়াগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে পারছে না কিছুতেই। তবে এতসবের মধ্যেও নাচ ঘিরে তাদের আবেগ, তাদের পাগলামিই বাঁচিয়ে রাখে তাদের, রাখে একজোট করে। সুপারসনিক-মিসফিটসের রেষারেষির মাঝেই কলেজের গান বিভাগের প্রধান প্রফেসর আইয়ারের (বোমান ইরানি) আকস্মিক মৃত্যুতে এলোমেলো হয়ে যেতে বসে সুপারসনিক। নিজের আন্তর্জাতিক খ্যাতি, কেরিয়ার বাজি রেখে দলটার হাল ধরতে আসে গ্র্যামিজয়ী জনপ্রিয় গায়ক, কলেজের প্রাক্তনী গগন আহুজা (নীল নীতিন মুকেশ)। 

 

 

 

 

 

যে কোনও মূল্যে যে সুপারসনিককে গোট-এ জেতাতে বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে, জীবনের কাছে হেরোদের দল মিসফিটসের পাশে দাঁড়ায় কলেজেরই ইতিহাসের অধ্যাপিকা পার্ল সালডানহা (জ্যাকলিন ফার্নান্ডেজ)। যার নিজের জীবনটাও মানসিক সমস্যায় মোড়া। দুই দলের টানাপোড়েন, ছাত্রছাত্রী থেকে তাদের মেন্টরদের ব্যক্তিগত হরেক সমস্যা, প্রতিযোগিতার তুমুল উত্তেজনা পেরিয়ে কোন দলের মাথায় উঠবে সেরার মুকুট? সেই নিয়েই এগিয়েছে অভিষেক শর্মা পরিচালিত সিরিজের গল্প। যার প্রতিটি পর্বের নামকরণ এবং শঙ্কর মহাদেবনের দুরন্ত সাউন্ডট্র্যাক ছুঁয়ে থেকেছে বলিউডের কালজয়ী একের পর এক গানকে।  দর্শকমনে সাধ্যমতো দাগ কাটতে চেষ্টা করেন নীল এবং জ্যাকলিন। 

 

 

 

স্যাবির চরিত্রে কটা চোখের ঝলমলে তরুণ সুমেধ নজর কাড়েন আলাদা করে। সুপারসনিক-এর সদস্য ফার্স্ট ইয়ারের পড়ুয়া বিক্রমের ভূমিকায় সিদ্ধার্থ নিগম কিংবা মিসফিটের অন্যতম সদস্য ‘গে’ পড়ুয়া কুশ হিসেবে প্রিয়াঙ্ক শর্মাকেও বেশ লাগে। সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিতে যথারীতি চোখ টেনেছেন বোমান। দুই দলের বাকি ছাত্রছাত্রীরাও যে যার মতো করে প্রাণবন্ত অভিনয়ের চেষ্টা করেন বইকি। গল্পে ছোট্ট এক চরিত্রে দেখা যায় ‘রোডিজ’-খ্যাত রঘু রামকে। শেষ এপিসোডে অতিথি চরিত্র হয়ে পর্দায় আসেন দুই জনপ্রিয় শিল্পী শঙ্কর মহাদেবন এবং শ্যামক দাভরও।   

 

 

 

 

সিরিজ জুড়ে তরুণ মনের আবেগ, তাদের প্রেম, মন ভাঙা, হারজিতের গল্প মন ছুঁতে চেষ্টা করেছিল যথেষ্টই। কিন্তু মুশকিল বাধল অন্যত্র। দর্শকের হাতে সময় এবং মনোযোগের বহর যেখানে রোজ রকেটগতিতে কমছে, সেখানে কুড়ি পর্ব ধরে একটা গল্প ধৈর্যচ্যুতি ঘটালে অবাক হওয়ার কিছু নেই। গল্পটাকে এতটা ডালপালা ছড়িয়ে, আড়েবহরে বাড়িয়ে না ফেলে টানটান দশ পর্বে শেষ করে দেওয়া যেতেই পারত হয়তো। কোথাও কোথাও সত্যিই খানিকটা অকারণ লম্বা লেগেছে সাবপ্লট। দ্বিতীয়ত, কলেজ জীবনের গল্পে ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত জীবন, সমস্যা, মনের খবর, জীবনবোধের কথা নিশ্চয়ই থাকবে। কিন্তু একই গল্পে মানসিক স্বাস্থ্যের হালচাল থেকে ট্রমা বা অবসাদের পরিণতি, যৌনতার রকমফের, প্রেম থেকে বিরহ, ছাত্র রাজনীতি থেকে অসম রেষারেষি, রিল বনাম রিয়েল জীবনের টানাপোড়েন, তারুণ্যের আবেগ থেকে পারিবারিক বাঁধন, দারিদ্র্যের বোঝা থেকে বিত্তশালী জীবনের ফাঁকফোকর, কাস্টিং কাউচ থেকে রিয়্যালিটি শোয়ের স্ক্রিপ্টেড দুনিয়া— এত কিছু এক থালায় বেড়ে দিতে গিয়েছে ধাক্কা খেয়েছে মূল গল্পের বুনোটটাই। গান বনাম নাচের প্রতিযোগিতার উন্মাদনার রেশ কেটে গিয়েছে বারে বারে। কলেজ কিসসার টকমিষ্টি স্বাদও কষাটে হয়ে গিয়েছে বেশ খানিকটাই।

 

 

 

 

তবে শান, অভয় যোধপুরকর, প্রগতি নাগপাল, শিবম মহাদেবন, ইয়াশিতা শর্মাদের কণ্ঠে নতুন গান কিংবা পুরনো গানগুলোর রিমেক, দুইই মন কাড়ে। বিশেষত প্রতিযোগিতার স্বাদে দলবেঁধে গাওয়া কাশ্মীরি ফোক ‘হুকুস ফুকুস’ কিংবা শঙ্কর মহাদেবনের ‘ব্রেথলেস’ অনবদ্য বলাই যায়। সিরিজে প্রাপ্তি বলতে তাই রয়ে গেল একগুচ্ছ দুর্দান্ত গান আর জমাটি কোরিওগ্রাফি।