ভোটের ময়দানে প্যাঁচপয়জারের গপ্পো। নতুন সিরিজ পলিট্রিকস দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত।
ভোটের ময়দানে টক্করের গল্প পর্দায় এসেছে আগেও। নেতাদের নীতি-দুর্নীতির লড়াইয়ের গল্প দেদার দেখেছেন দর্শক। বিষয়টা মোটেই নতুন ছিল না। তবে এ ধরনের গল্পে খুন-জখম, হিংসা-প্রতিহিংসার পাল্লাই ভারী থাকে সাধারণত। কিন্তু ঘোর বাস্তবে ভোট-পরবর্তী ডিম আর মিম ছোড়াছুড়ির এই ভরা মরশুমে ওটিটি পর্দায় পলিটিক্যাল কমেডি ব্যাপারটা মন্দ লাগার কথা নয়। সে চেষ্টাটাই করে ফেলল ফ্রাইডে প্ল্যাটফর্মে। রাজনীতির প্যাঁচ-পয়জারে হাল্কা মেজাজে খানিকটা হাসির মশলা মিশিয়ে হাজির করল ‘পলিট্রিকস’। দেবাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় চার পর্বের ছোট্ট সিরিজে দর্শকের প্রাপ্তির ঝুলিতে আর একটা জিনিস রইল মনের মতো। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে আরও একবার পর্দায় ফিরে পাওয়া।
এ গল্প বালুরঘাটের কাশীপুরের। গোটা গ্রামের মানুষ একডাকে চেনে পোল্ট্রি ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাজার সমিতির নেতা বিষ্ণুচরণ ঘোষকে (সৌরভ দাস)। পাড়া-বেপাড়ার যে কোনও মানুষের বিপদে সে জান লড়িয়ে দেয়। করোনায় যখন গোটা গ্রাম বিপর্যস্ত, তখনও সে-ই ঢাল হয়ে দাঁড়ায় পাশে। গোটা কাশীপুর তাই তাকে মাথায় করে রাখে। স্ত্রী সুলোচনা (অরুণিমা ঘোষ)কে নিয়ে বিষ্ণুর ছোট্ট সংসারে ভালবাসার অভাব নেই। তার দোকানের বৃদ্ধ কর্মী নেপাল (প্রদীপ ভট্টাচার্য) এবং বাকি তিন তরুণ কর্মী দাদা বলতে অজ্ঞান। এ হেন দাদা ওরফে ‘চিকেন বিষ্ণু’ও তাদের প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। সারাদিনের খাটনি পেরিয়ে দোকানের দোতলায় বসে মদের আসর। সে আসরে নিয়মিত আসেন এলাকার নেতা ধ্রুব সেনগুপ্ত (রতন সরখেল)। বিষ্ণু তাঁকে পুরোদস্তুর বিশ্বাস করলেও নিজের মেয়ে (সায়নী ঘোষ) ও জামাই, এলআইসি এজেন্ট পিনাকী (রাহুল) ধ্রুবর ধূর্ততার বহর চেনে হাড়ে হাড়ে। ইতিমধ্যে ব্যবসায়ী সমিতির নেতা থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখার সাধ জাগে বিষ্ণুর। ধ্রুবর কাছে এমএলএ হওয়ার টিকিট চেয়ে সে তদ্বির করলে তিনিও বোঝেন এই মওকা। সাধাসিধে বিষ্ণুকে টোপ দিয়ে দু’কোটি টাকা আদায় করে যথারীতি তিনি মুখ মুছে ফেলেন। বাজারে পাহাড়প্রমাণ দেনা করে টাকা জুগিয়েও এমএলএ হওয়ার টিকিট আর জোটে না বিষ্ণুর। এবার সে কী করবে? কীভাবে শোধ হবে ঋণ? নাকি হাঁটতে হবে প্রতিশোধের পথে? রাজনীতির দুনিয়ার পাঁকে ভরা চক্রে চড়কিপাক খাওয়ার সেই গল্পই বলেছে ‘পলিট্রিকস’।
পিনাকীর চরিত্রে রাহুলের বলিষ্ঠ অভিনয় এ সিরিজের পাওয়ার খাতা ভরিয়ে দেয় বরাবরের মতোই। তাঁকে অকালে হারানোর আফশোস যে আরও একবার ঘিরে ধরবে, সে তো বলাই বাহুল্য। বিষ্ণু হিসেবে সৌরভ যথারীতি নরমে-গরমে মাতিয়ে দিয়েছেন। নেতাসুলভ হাঁকডাক থেকে স্ত্রীর সঙ্গে টুকরো টুকরো প্রেমের মুহূর্তের কোলাজ, সবেতেই বেশ লাগে তাঁকে। এ গল্পে সুলোচনার সফর জীবন্ত হয়ে ওঠে অরুণিমার হাত ধরে। ছোট্ট চরিত্রে ভাল লাগে সায়নীকেও। সংক্ষিপ্ত পরিসরেও অভিনয়ের দ্যুতিতে যথারীতি চোখ টেনে ছেড়েছেন প্রদীপ-রতনদের মতো অভিজ্ঞ শিল্পীরা।
সহজ-সরল, সরলরেখায় চলা এক গল্প। গ্রামের রোজনামচা, তার ছাপোষা ঘর থেকে নেতা-মন্ত্রীদের পারিবারিক বিলাসের বৈপরীত্য— সবটাই উঠে আসে চরিত্রদের জীবন বেয়ে। মোটের উপর সরলরেখা ধরে হাঁটে প্রতিটা চরিত্রও। শেষের মোচড়টা প্রত্যাশিত হলেও দেখতে মন্দ লাগে না।
তবে হ্যাঁ, খামতি আছে অবশ্যই। যেমন, গল্পের চরিত্রদের চলনে ওঠাপড়া নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তির শক্তি নেই। বিশেষত যেমন সিরিজের দ্বিতীয়ার্ধে কর্মীদের প্রতি সুলোচনার কিছু আচরণের ব্যাখ্যা মেলেনি। আবার সরকার পক্ষের নেতা ধ্রুবর সঙ্গে তাঁর মেয়ের এমন আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক কেন, উত্তর নেই তারও। মোটের উপর গোটা সিরিজেই তথ্য এবং যুক্তির জায়গাগুলো কেমন যেন হালকা হাতে বোনা, দায়সারা করে ছুঁয়ে যাওয়া।
তা ছাড়া, ছোটগল্প সিনেমায় দেখতে যতটা মনোগ্রাহী লাগে, সিরিজ হিসেবে তাকে টেনে এগিয়ে নিয়ে যেতে খানিক ঘটনার ঘনঘটা জরুরি। সহজ সরল, সরলরেখায় চলা গ্রামজীবনের গল্প হলেও যে স্রেফ প্রতিটা চরিত্রকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, তাদের বুনতে বুনতে দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে নেওয়া যায়, হিন্দিতে সে কাজটা সফলভাবে করে দেখিয়েছে ‘পঞ্চায়েত’। এ ক্ষেত্রে ‘পলিট্রিকস’কে পাশমার্ক দেওয়া কঠিন। সিরিজ হওয়ার মতো দৈর্ঘ্য নেই। চারটে আধ ঘণ্টার পর্বে গল্প ফুরিয়ে গেলে এখনকার ওটিটি দুনিয়ায় বরং খানিকটা বেমানানই ঠেকে। যেন, এই তো শুরু হল, ওমনি হুশ করে শেষ! মাইক্রোড্রামা বা মিনি সিরিজ হলে আলাদা কথা ছিল। কিন্তু পর্বের দৈর্ঘ্যে সে হিসেবও তো মিলছে না।
দেখেশুনে মনে হয় যেন সিরিজ নয়, ছবি হলেই পারত এ কাহিনি। চার পর্বে ভাগাভাগির বদলে বরং একটানা চলে শেষ হলেই ভাল হত। প্রতিটা কনটেন্ট ফর্মের তো একটা নির্দিষ্ট ধরন এবং চলন থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, দর্শকের ইদানীং দ্রুত ধৈর্যচ্যুতি ঘটে বলেই কি এভাবে এ গল্পটাকে পুঁচকে সিরিজ করে পর্দায় আনার ভাবনা? নাকি আসলে ছবি হিসেবেই তৈরি হওয়ার কথা ছিল তার? ধন্দ থেকেই গেল।















