ধারাবাহিক, টলিউড কিংবা বলিউড— সব মাধ্যমেই নিজের ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে অভিনয়ের জাত চিনিয়েছেন তিনি। শুধু দুর্দান্ত অভিনয়ই নয়, বয়স যত বাড়ছে, তাঁর তাক লাগানো ফিটনেস আর আভিজাত্য দেখেও চোখ কপালে ওঠে অনুরাগীদের। তিনি টোটা রায়চৌধুরী। আজ তাঁর ৫০তম জন্মদিন! কিন্তু তাঁকে দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে জীবনের ‘হাফ সেঞ্চুরি’ করে ফেললেন এই অভিনেতা। এই বিশেষ দিনে ব্যস্ততার ফাঁকে আজকাল ডট ইন-এর মুখোমুখি হয়ে ডায়েট থেকে শুরু করে টলিউডের প্রতারণা ও আন্ডারেটেড তকমা নিয়ে এক্কেবারে মনখোলা আড্ডায় মাতলেন অভিনেতা।
টোটাদা, প্রথমেই জানাই জন্মদিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা। এবং অবশ্যই ভালবাসা।
টোটা: অনেক ধন্যবাদ, রাহুল। আপনিও আমার শুভেচ্ছা নেবেন।
আজ নিশ্চয়ই ডায়েট মানেননি?
টোটা: (হেসে উঠে) ধুর, ধুর! দেখুন, জন্মদিনে ডায়েট মানাটা অপরাধ। নানান স্বাদের রকমারি মিষ্টিও খেয়েছি পেট পুরে। আর একটা কথা, কোনওকালেই আমি কষে ডায়েট মেনে চলে বিশ্বাসী নয়। ছ'দিন মেপে খেলাম, বুঝেশুনে আর সপ্তাহের একটা দিন জমিয়ে খেলাম। ওই যাঁরা বলে আসছেন তাঁরা নাকি স্রেফ দই-শশা খেয়ে থাকেন, আমি তাঁদের দলে নেই! একেবারেই নেই! কোনওদিন ছিলামও না।
আজকের দিনে বিশেষ কোনও রেজোলিউশন?
টোটা: সত্যি কথা বলতে কী, গত ৩০ বছর ধরে আলাদা করে এই দিনে আর রেজোলিউশন নিই না। কারণ নিজের কাছে আমি সৎ যে আমার একটাই লক্ষ্য -শিরদাঁড়া উঁচু করে সৎ থেকে ভাল কাজ করে যাওয়া, দারুণ সব কাজ খুঁজে যাওয়া। ওই রেজোলিউশনটা এখনও বহাল তবিয়ে মেনে চলতে পারছি বলেই আলাদা করে আর নতুন কিছু নেওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।
আর কেউ যদি আপনার সঙ্গে সততার ধার না ধারে? এই ইন্ডাস্ট্রিতে সততার দাম কি সবসময় পাওয়া যায়?
(ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস) আমি বুঝতে পারছি, আপনি কী বলতে চাইছেন। হ্যাঁ বিশ্বাস করে ঠকেছি এ ইন্ডাস্ট্রিতে। তবে প্রথমবার যদি কোনও ব্যক্তির কাছে প্রতারিত হই, আমি সেই দোষটা তাঁকেই দেব। কিন্তু দ্বিতীয়বারও যদি ওই একই ব্যক্তির তরফে প্রতারিত হই, তাহলে সেই দোষ আমার উপর বর্তায়, কারণ আমিই তাঁকে সেই সুযোগ দিয়েছিলাম। তাই একবার যেখানে আমি প্রতারিত হই, সেই জায়গা থেকে নিজেকে অনেকটা সরিয়ে ফেলি। আর ওই ব্যক্তিরও সংস্পর্শে থাকি না।
বড়পর্দা, টেলিভিশন, সিরিজ -সব জায়গাতেই দারুণভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ৫০ ছুঁয়ে তবু কোনও আফসোস মনের কোণে উঁকি দেয়?
টোটা: (একটু ভেবে) সত্যি বলব? হয় না। কারণ যেটা হওয়ার সঠিক সময়েই হবে। ঈশ্বর যখন যাঁকে যা দেওয়ার দু'হাত ভরে দেবেন। আমার জন্য হয়তো ভেবে রেখেছিলেন আর একটু ঘষামাজা প্রয়োজন। কোথাও কোথাও ব্রাশ-আপ প্রয়োজন। তাই যা হয়েছে একদিক থেকে ভাল-ই হয়েছে। এখন আমি পাচ্ছি। আর আফসোস হয় না।
কী বলছেন? বাংলা ছবির দর্শকেরা আজও এক বাক্যে বলেন টোটা রায়চৌধুরী টলিপাড়ার অন্যতম আন্ডারেটেড অভিনেতা। আক্ষেপ কিংবা ভাললাগা কোনওটাই হয় না?
টোটা: (স্মিত হেসে) শুনে মনে হয়, এখনও তাহলে আমার কাছে একটা সুযোগ আছে দর্শককে চমকে দেওয়ার! আরও একটু চরিত্র নির্বাচনে মন দিয়ে করলে হয়তো দর্শকের কাছে নিজেকে অন্যভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব। কারণ অনেক অভিনেতাই আমার বয়সে পৌঁছে ওভার-এক্সপোজড হয়ে যান। আবার এত সাফল্য পেয়ে যান যে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আসলে...আসলে তূরীয় সাফল্য না অনেকটা দো-ধারি তলোয়ারের মতো। অন্যকে যেমন কাটে আবার নিজের হাতও কেটে দিতে পারে! তাই চূড়ান্ত জনপ্রিয়তা শিল্পী হিসেবে আমাদের উত্তরণটাকে বাধা দেয়। কারণ একটি বিষয়ে সাফল্য পেতে পেতে তা ধরে রাখতে ওই পরিসরেই আটকে থাকে সে। এটা কিন্তু বিপজ্জনক। তাই তথাকথিত সাফল্যটা ওই বয়সে পায়নি বলে শিল্পীর উদগ্র ক্ষিদেটা আমার মধ্যে আজও বেঁচে রয়েছে।
আচ্ছা, টোটাদা ইন্ডাস্ট্রিতে কান পাতলে শোনা যায় আপনি এক সময় দুর্দান্ত হাত গণনা করতে পারতেন। অপরাজিত আঢ্য-রও হাত দেখেছিলেন এবং আপনার কথা নাকি মিলেও গিয়েছিল। নিজের হাত দেখেছেন কখনও?
টোটা: (হাসতে হাসতে) এই রে! না, না অল্প একটু শিখেছিলাম। চর্চার অভাবে সব ভুলে গিয়েছি। এখন আর একদম পারি না। আমার দাদু দুর্দান্ত হাত গুণতে পারতেন। অব্যর্থ ছিল ওঁর বলা কথা। আমার খুব ভাল লাগত, তা শেখার চেষ্টা করেছিলাম পামিস্ট্রি। কিন্তু ভীষণ কঠিন এই বিষয়। মন দিয়ে শিখতে হয়, নিয়মিত চর্চা করতে হয়। তাই একটা সময়ের পর রণে ভঙ্গ দিয়েছিলাম। আর নিজের হাত কখনও দেখার বোঝার চেষ্টাই করিনি! টিটো'দা মানে অভিনেতা দীপঙ্কর দে একটা সময় দুর্দান্ত হাত দেখতে পারতেন। জ্যোতিষ চর্চা করতেন, খুব ভাল ফলত ওঁর বলা কথা। তবে এটুকু বলে রাখি, আমি ব্যক্তিগত বিশ্বাস করি যা হওয়ার তা হবেই। ভাগ্যলিপি খণ্ডাবে কে?
বেশ। আর কাজকর্ম? পাইপলাইনে কী কী আছে?
টোটা: বলিউডের দু'টি বড় প্রজেক্টে করেছি। আগেভাগে নাম প্রকাশ করে দিলে বিপদ আছে....আপনি তো জানেনই। এটুকু বলতে পারি, দুটোই বেশ বড় মাপের প্রজেক্ট। একটি ওয়েব সিরিজ আর একটি বড়পর্দার ছবি। আগামী বছরেই মুক্তি পাবে। আর বাংলায় সৃজিতের ছবিতে কাজ করেছে। পুজোতে মুক্তি পাবে 'এম্পারার ভার্সেস শরৎচন্দ্র'ক। ছবিতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছি। আমার কাছে ভীষণ স্পেশ্যাল এই ছবি। আর ফেলুদা!
ফেলুদা সেজে ফের এ বছর ওটিটি-তে আসছেন তাহলে? এবারে কোন গল্প?
টোটা: আমার তো ভীষণ ইচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বছর ফের ডিসেম্বরে হাজির হবে ফেলুদা অ্যান্ড কোং। আসলে, ফেলুদার গল্প তো খানিক ট্র্যাভেলগ, বাইরে শুটিং। তাই আবহাওয়া একটা বড় ব্যাপার। দেখা যাক। আর কোন গল্প জিজ্ঞেস করবেন না কারণ আমিও জানি না। আমি ফের ফেলুদা সাজতে পারছি, এটাই আমার কাছে অনেক!
একদম শেষ প্রশ্ন। ৫০ ববছরের এই যুবক কুড়ির কোঠায় থাকা যুবকদের কী টিপস দেবেন?
টোটা: যা করবে সৎভাবে করবে, মন দিয়ে করবে। কর্মক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত জীবনে যেখানে যা-ই হোক না কেন। মনের আনন্দে থাকাটা খুব জরুরি। আর শরীরচর্চাটা কিন্তু মাস্ট!
অনেক ধন্যবাদ টোটা'দা। আরও একবার জন্মদিনের শুভেচ্ছা রইল।
টোটা: থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ (হাসি)















