ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় আর নেই। বুধবার (২৯ জুলাই) তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতজগৎ। শতবর্ষ পেরিয়েও যিনি নিয়মিত রেওয়াজ, গবেষণা এবং সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন, তাঁর বিদায়ে এক ঐতিহ্যের অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

বুধবার দুপুর ২.৩০ নাগাদ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন শিল্পী৷ গত ৮ জুলাই থেকে কোমরের হাড়ে সমস্যার কারণে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল৷ হাসপাতাল থেকে ফিরে এলেও দিন দুয়েক আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছিল৷

১৯২৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি উত্তর কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত পরিবারে জন্ম অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর বাবা ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রখ্যাত সঙ্গীতাচার্য সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে সঙ্গীতের হাতেখড়ি। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কিছুদিন সরকারি চাকরি করলেও শেষ পর্যন্ত সঙ্গীতকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে বেছে নেন।
অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু অসাধারণ খেয়ালশিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সঙ্গীত-গবেষকও। ১৯৬৮ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন এবং দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা করেন। পরে বিভাগীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অবসরের পর বিশ্বভারতীতেও ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর লেখা সঙ্গীতের শিল্পদর্শন আজও গবেষকদের কাছে মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
বিষ্ণুপুর ঘরানার ঐতিহ্যকে আধুনিক সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ধ্রুপদ, খেয়াল ও রাগসঙ্গীতের গভীর ব্যাখ্যা, নিখুঁত স্বরসাধনা এবং বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনার জন্য তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন। অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর কাছে তিনি ছিলেন শুধু শিক্ষক নন, একজন পথপ্রদর্শক।
শতবর্ষেও তাঁর কণ্ঠের দৃঢ়তা এবং মানসিক সতেজতা বিস্মিত করেছিল সঙ্গীতপ্রেমীদের। 

চলতি বছরই শতবর্ষ উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানে তিনি রাগ বেহাগ পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানের পর বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী অজয় চক্রবর্তী তাঁর পরিবেশনার প্রশংসা করে বলেছিলেন, এত বয়সেও এমন পরিণত রাগপ্রদর্শন সত্যিই বিরল।

দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সঙ্গীত মহাসম্মান, ভীষ্মদেব পুরস্কার, গিরিজাশঙ্কর পুরস্কার-সহ একাধিক স্বীকৃতি তাঁর ঝুলিতে এসেছে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিধু-কানহু-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট প্রদান করে সম্মান জানিয়েছে।

পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে শুধু একজন শিল্পীর মৃত্যু হল না, বাংলা তথা ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত হারাল এক চলমান প্রতিষ্ঠানকে। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর গবেষণা, তাঁর শিক্ষাদান এবং তাঁর সঙ্গীতভাবনা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে যাবে। বিষ্ণুপুর ঘরানার যে দীপশিখা তিনি আজীবন জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, তা তাঁর ছাত্র, অনুরাগী এবং সঙ্গীতসাধকদের হাত ধরে আরও বহুদিন প্রজ্বলিত থাকবে।
সুরের সেই নিরলস সাধক আজ নীরব। কিন্তু তাঁর সাধনা, তাঁর দর্শন এবং তাঁর রেখে যাওয়া সুর চিরকাল বেঁচে থাকবে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে।