সহজ মৃত্যু। দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি। বারবার কাতর আবেদন করেও আদালতের কাছে নিজের ‘মুক্তি’ জোটেনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ‘জাদুকর ইথান মাস্ক্যারেনহাস’-এর। তাঁর সহজ, সপাট, দৃপ্ত আবেদনের মধ্যে দীর্ঘ বছরের যন্ত্রণা, কাতরতা অনুভব করে বুক মুচড়ে উঠেছিল আমি জনতার। তবু হাকিম নড়েননি। হুকুম-ও। আদালত চত্বর থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছিল ‘ইথান’। তারপর নিজেই মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু উপহার দিয়েছিল, যা আদালত তাকে দেয়নি। ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘গুজারিশ’-এ ‘ইথান’রূপী হৃতিক এইভাবে তুফান তুলেছিল দর্শকহৃদয়ে। এরপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ১৬টি বছর। পর্দায় আদালত যা শুনেও বুঝতে চায়নি, এতদিনে বাস্তবে তা হল। ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ৩২ বছরের যুবক হরিশ রানাকে অবশেষে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু’র অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট।
ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক আবেগঘন ও নজিরবিহীন অধ্যায়। ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা ৩২ বছরের যুবক হরিশ রানাকে অবশেষে ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু’র অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবারের এই রায়ে কার্যত প্রথমবার কোনও নির্দিষ্ট মামলায় প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমোদন দিল দেশের শীর্ষ আদালত।দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে প্রায় অচেতন অবস্থায় বিছানায় পড়ে ছিলেন হরিশ। জানা যায়, ১৩ বছর আগে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের চার তলা থেকে পড়ে মারাত্মক চোট পান তিনি। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ রয়েছেন তিনি। অর্থাৎ সম্পূর্ণ অচেতন, নিজে থেকে কোনও সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাও নেই। এতদিন নলের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে খাবার ও চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে জীবিত রাখা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা আগেই জানিয়েছিলেন স্বাভাবিক জীবনে হরিশের আর ফেরার কোনও সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এই মামলার শুনানিতে বিচারপতিজে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথন-এর বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী হরিশের সুস্থ হয়ে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনাই নেই। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এভাবে শুধু একটি প্রাণকে কৃত্রিমভাবে ধরে রাখা হচ্ছে, যার উন্নতির কোনও সম্ভাবনা নেই। তারপরেই এই ঐতিহাসিক রায়।
রায়ে হরিশের বাবা-মায়ের অসাধারণ লড়াইয়ের কথাও উল্লেখ করেছে আদালত। বিচারপতিরা বলেন, ভালবাসা মানে শুধু সুখের দিনে পাশে থাকা নয়, অন্ধকারের দিনেও হাত না ছাড়া। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে ছেলের শয্যার পাশে থেকে সেই লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তাঁরা।মামলায় যুক্ত দুই মেডিক্যাল বোর্ড—প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি—দুটিই জানিয়েছে, হরিশের ক্ষেত্রে কৃত্রিম খাদ্য সরবরাহ ও অন্যান্য চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই মানবিক সিদ্ধান্ত। আদালতও সেই মতামত মেনে নেয়।এই রায়ের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারকে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য নির্দিষ্ট আইন তৈরির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক কমন কজ ভার্সেস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। পরে ২০২৩ সালেও সেই নির্দেশিকায় কিছু সংশোধন আনা হয়। কিন্তু এতদিন কোনও নির্দিষ্ট মামলায় সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হয়নি। হরিশ রানার ক্ষেত্রে সেই আইনি পথই এবার কার্যকর হল।আদালত নির্দেশ দিয়েছে, দিল্লির এইমস-এ হরিশকে ভর্তি করে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে ধাপে ধাপে তাঁর শরীর থেকে সব নল ও কৃত্রিম চিকিৎসা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে।
দীর্ঘ যন্ত্রণার পথ পেরিয়ে হরিশ রানার জীবনের এই অধ্যায় শেষ হতে চলেছে। আদালতের ভাষায়—এক মানুষের জীবনের শেষটুকুও যেন মর্যাদা ও মানবিকতার সঙ্গে ঘটে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ এই কঠিন সিদ্ধান্তকে আরও সহজভাবে গ্রহণ করতে শিখবে কি? প্রশ্ন তুলেছিল গুজারিশ। এবার সেই প্রশ্নটিকেই তার সমাধানের কাছে আরও একটু এগিয়ে দিল দেশের শীর্ষ আদালত। সদার্থকভাবেই।
&t=371s
