আজ থেকে ঠিক ২৫ বছর আগে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি ‘লগান’। ১৮৯৩ সালের ব্রিটিশ রাজের পটভূমিতে তৈরি চম্পারনের গ্রামের সেই ক্রিকেট ম্যাচ আর ভুবনের জেদ আজও প্রতিটি ভারতীয়র মনে টাটকা। আর এই ছবির ২৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে ‘লগান’-এর বিশেষ থিয়েট্রিক্যাল রিলিজ এবং কাস্ট রিইউনিয়নের আয়োজন করা হয়েছিল।
ঠিক ২৫ বছর আগে যে ব্রিটিশ অফিসারকে দেখে গোটা ভারতের দর্শক রাগে ফেটে পড়েছিল, সেই ক্রূর ‘ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রু রাসেল’ ওরফে ব্রিটিশ অভিনেতা পল ব্ল্যাকথর্ন — আজ আবার ফিরে এসেছেন মুম্বইয়ে। তবে এবার ভয় বা ঘৃণা নয়, মুম্বইয়ের মাটিতে পা রাখতেই তাঁকে ভালবাসা ও আবেগে ভরিয়ে দিলেন ভারতীয়রা। ‘২৪’ এবং ‘অ্যারো’-খ্যাত এই অভিনেতা মুম্বইয়ের এই রিইউনিয়নের উৎসবে এসে ২৫ বছর আগের সেই ছবির শুটিংয়ের একঝাঁক হাড়হিম করা ও মজাদার গোপন স্মৃতি শেয়ার করলেন।
‘লগান’ ছবির সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল সেই বাজি ধরার দৃশ্যটি, যেখানে ভুবনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে ক্যাপ্টেন রাসেল বলেছিলেন— ক্রিকেট ম্যাচে জিতলে তিন বছরের ‘লগান’ (কর) মাফ, আর হারলে ‘তিন গুণ লগান’ দিতে হবে। এই দৃশ্যটি শুটের ঠিক আগের মুহূর্তের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন পল ব্ল্যাকথর্ন।
পল হাসতে হাসতে বলেন:“দৃশ্যটি শুটিংয়ের ঠিক আগে আমি ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। তখনই আমির খানও আমার ঠিক পাশের বেসিনে আসেন। ও আমার দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বলল, ‘ওহ পল, এই দৃশ্যটা কিন্তু বড্ড গুরুত্বপূর্ণ। গোটা সিনেমার সবচেয়ে দরকারি দৃশ্য কিন্তু এটাই!’ ওঁর মুখে ওভাবে হঠাৎ পেপ টক শুনে আমি তো বাথরুমে পুরো জমে বরফ হয়ে গিয়েছিলাম! মনে মনে ভাবলাম, হে ভগবান! তারপর কোনওতে কাঁপা গলায় আমিরকে বললাম, ‘অবশ্যই স্যার, আমি আমার সেরাটা দেব। ঠিক আছে, এবার হাত ধুয়ে চলুন শুটিংয়ে যাওয়া যাক!’”
সিনেমায় ক্যাপ্টেন রাসেলকে যতই বিধ্বংসী ব্যাটার হিসেবে দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে পলের ক্রিকেটের জ্ঞান ছিল শূন্য! পল ভেবেছিলেন তিনি যেহেতু ব্রিটিশ, তাই ক্রিকেটটা ওঁর রক্তে আছে। কিন্তু গুজরাটের সেটে আমির খান যখন কাস্টদের মন ভাল করতে একটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচের আয়োজন করেন, তখন পলের আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে।
পল সেই মজাদার স্মৃতি হাতড়ে বলেন, “আমি খুব ভাব নিয়ে ক্রিজে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর প্রথম বলেই বোল্ড আউট! আমির খুব ভদ্রতা দেখিয়ে বলল, ‘আরে না না, এটা প্র্যাকটিস বল ছিল, তুমি আবার খেলো’। আমি আবার স্টান্স নিলাম, আর দ্বিতীয় বলেও ক্লিন বোল্ড! তখন আমির আমার দিকে অত্যন্ত সিরিয়াসলি তাকিয়ে বলল, ‘পল, মনে হচ্ছে লাঞ্চ ব্রেকে তোমার ক্রিকেট নিয়ে আমাদের একটু খাটতে হবে’।”
পল জানান, এরপর প্রতিদিন লাঞ্চ ব্রেকে তিনি প্র্যাকটিস করতেন। পর্দায় যে রাসেলকে বড় বড় শট মারতে দেখা গেছে, তা আসলে এডিটিংয়ের ম্যাজিক! শুটিংয়ের সময় পলের ঠিক সামনে একজন দাঁড়িয়ে খুব আলতো করে বল ছুড়ে দিতেন আর পল বারবার সেটাতেও মিস করতেন!
ছবিতে নিখুঁত হিন্দি বলার জন্য পল ব্ল্যাকথর্ন শুটিং শুরুর আগে লন্ডনে টানা চার মাস ধরে হিন্দি ভাষা শিখেছিলেন। তিনি শুধু নিজের সংলাপ মুখস্থ করতে চাননি, বরং ওঁর চারপাশে বাকি চরিত্ররা কী বলছে, সেটাও বুঝতে চেয়েছিলেন। যদিও ২৫ বছর পর মুম্বইয়ে এসে স্ক্রিপ্ট রিডিং-এর সময় পল স্বীকার করেন যে তিনি এখন আর হিন্দি হরফ পড়তে পারছেন না!
২০০১ সালে ছবি মুক্তির পর ভারতের অলিতে-গলিতে যেভাবে ওঁর বলা সংলাপ জনপ্রিয় হয়েছিল, তা পলের কাছে ছিল অকল্পনীয়। পল বলেন, “ছবি মুক্তির কিছুদিন পর আমির আমাকে ফোন করে বলেছিল, ‘পল, ভারতের রাস্তায় লোকজন ঘুরে ঘুরে তোমার ডায়ালগ বলছে!’ আমি তো শুনে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম।” ২৫ বছর পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালেও আমির খানের সঙ্গে ওঁর সেই অনস্ক্রিন টক্কর ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে রয়ে গেল।















