২১ ফেব্রুয়ারি ছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এইমুহূর্তে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা ভাষা বলার অপরাধে যেমন আক্রান্ত পরিযায়ী শ্রমিকরা তেমনই হেনস্থা হতে হচ্ছে অন্য রাজ্যে বাস করা বাঙালিদেরও। তার-ই প্রতিবাদে দক্ষিণ কলকাতার বাঘা যতীনে আয়োজন করা হয়েছে ‘একুশে বইমেলা’। তাই তো এই বইমেলার থিম, ‘আক্রান্ত আমার ভাষা’। মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন ১০০টির মতো প্রকাশনা ও লিটল ম্যাগাজিন। একুশে বইমেলার আয়োজনে পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ৯২ নং ওয়ার্ডের পৌরমাতা বসুন্ধরা গোস্বামী।
ভাষা মানেই শুধুই সংস্কৃতি নয়। রাজনীতিও। তাই তো বাংলা বলার অপরাধে বাংলাদেশি সন্দেহে মালদহের কালিয়াচকের পরিযায়ী শ্রমিক আমির শেখকে গ্রেপ্তার করে রাজস্থানি পুলিশ। বাংলাদেশে পুশব্যাক করে দেওয়া হয়েছিল এই বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে। যেখানে তিনি জেল খেটেছেন তিন মাস। ফিরে এসে দিন গুজরান চলছে কোনওভাবে। সেই অভিজ্ঞতাই দক্ষিণ কলকাতার বাঘা যতীনের একুশে বইমেলায় তুলে ধরলেন আমির – “রাজস্থানে গিয়েছিলাম পেটের দায়ে।কাজের জন্য। স্রেফ বাংলা বলার জন্য গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। রাজস্থানি পুলিশ আমাকে বাংলাদেশি সন্দেহে গ্রেপ্তার করে বিএসএফ-এর হাতে তুলে দিয়েছিল। বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতার গেট খুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ওপারে। একটু বেচাল দেখলেই গুলি চলবে জানিয়েছিল। তারপর তো...বাংলাদেশের জেলে ঢুকিয়ে দেয় আমাকে। সেই বিভীষিকা আজও ভুলতে পারিনি...” বলতে বলতে গলা কেঁপে ওঠে তাঁর।
এই একই ঘটনার সম্মুখীন আরও তিন পরিযায়ী শ্রমিক -সিদ্ধার্থ মাঝি, শংকর নায়েক, বাপী মাইতি। তিনজনেই পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুর গ্রামের বাসিন্দা। কেউ উড়িষ্যায় কাজ করতে গিয়েছিলেন কেউ বা গুজরাটে। কেউ করতেন মুটে-মজুরি কেউ বা বাড়ি গিয়ে পরচুলা বানানোর জন্য চুল সংগ্রহের কাজ, “আমরা মুটে-মজুর। বাংলা ভাষা ছাড়া তো অন্য কিছু জানি না, প্রায় বুঝি না। সেই বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে গিয়ে কাজ হারিয়েছি, প্রাণ সংশয় হয়েছে।” শংকর নায়েক জানান, বর্তমানে নিজের গ্রামে তো বটেই আশেপাশের গ্রামেও মুটে মজুরি কোনওরকমে সংসার চলে তাঁর।
“বিগত সময়ে বাংলা ভাষায় কথা বলা নিয়ে যে পরিসর তৈরি হয়েছে, তাতে সবচাইতে বেশি আক্রান্ত বাঙালি মুসলিম। বাংলা ভাষায় কথা বলা মুসলমানরা। বাংলা ভাষার নাম হয়েছে এখন বাংলাদেশি ভাষা। এই প্রসঙ্গে দিল্লির একাধিক ঘটনা শিরোনামে যেমন এসেছে, তেমন আরও বিষয় সংবাদ শিরোনামে এসেছে যা রীতিমতো হাড় হিম করা!” বাংলা ভাষার জন্য লড়াইয়ে সোচ্চার, সরব ৭৭-এর নওজওয়ান কবীর সুমন।

সুর চড়িয়ে সুমন বলে চললেন, “জ্যোতি বসু একবার বলেছিলেন, ‘আমাকে মোটা-মোটা বই দেবেন। কারণ পড়তে অনেকক্ষণ লাগে, তাই সময়টা কেটে যাবে।’ আর আমি বলছি, শুধু মোটা মোটা বই দেবেন পড়ার জন্য নয়। সেটা দিয়ে যেন মারতেও পারি! আমার মায়ের ভাষা আক্রান্ত। আমার মা আক্রান্ত, দিদি আক্রান্ত, আমার প্রেমিকা আক্রান্ত। এবার মেরে ফাটিয়ে দিতে হবে!" জ্বালাময়ী বক্তব্যের পর এবার খানিক নরম সুমন – “যে ভাষার জন্য এত কিছু হচ্ছে, সে ভাষার বিরুদ্ধে যদি এত কিছু হয়, তাহলে প্রতিহত করতে হবে। প্রতিরোধ করতে হবে।”
&t=2s
১৯৫১ সালে ভাষার লড়াইয়ে উর্দুর বিরোধিতা করে বাংলাকে জিতিয়েছিল পাঁচ বাঙালি। সেই স্মৃতি আজও টাটকা দুই বাংলায়। ভাষা-ই সেতুবন্ধন করে দিল পশ্চিম এবং পূর্বের।
