১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব রেডিয়ো দিবস। যোগাযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে রেডিওর গুরুত্ব ও অবদানকে স্বীকৃতি দিতেই এই দিনটি উদযাপন করা হয়। সমাজে একটা সময়ে রেডিওর ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। সভ্যতার অগ্রগতির নিয়ম মেনেই আজ তার রূপ খানিক বদলেছে, দাপট খানিক কমেছে। কিন্তু রেডিও তরঙ্গর গুরুত্বও কি পাল্লা দিয়ে কমেছে? রেডিওর ভবিষ্যৎ-ই বা ঠিক কী? সেসব নিয়েই আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে কথা বললেন জগন্নাথ বসু এবং স্বপ্নময় চক্রবর্তী।
বাংলা শ্রুতিনাটক ও আবৃত্তি নিয়ে দীর্ঘ দিন চর্চা করছেন জগন্নাথ বসু। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর পর বাঙালির কাছে রেডিওকে জনপ্রিয় করে তোলার মধ্যে যেসব নাম উঠে আসে, তাঁদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে ঘোরাফেরা করে এই শিল্পীর নাম। আজকাল ডট ইন-কে অল্প কথায় শিল্পী বললেন, " টেলিভিশন আসার পর রেডিও সভ্যতায় খানিক ধাক্কা লেগেছিল। কিন্তু ভেঙে পড়েনি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, কোনও দেশেই কিন্তু রেডিও পিছিয়ে নেই। আমাদের দেশেও রেডিও যে খুব পিছিয়ে পড়েছে, এমনটা কিন্তু নেই। বরং আমি তো বলব, এমন কিছু প্রোগ্র্যাম রেডিওতে হয় এবং সেসব শর্তাদের এমনভাবে ছুঁয়ে যায় যা অন্য কোনও মাধ্যমে হওয়া মুশকিল! বিষয় নির্বাচন, সূক্ষ্মতা, ভাবনা, যে গভীরতা, সাহিত্যের সূক্ষ্মতা -সব মিলিয়ে রেডিও একটা ইউনিক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। পঙ্কজ কুমার মল্লিক, রায়চাঁদ বড়ালের মতো শিল্পীদের তো রেডিও-ই তৈরি করেছে! তাই রেডিওকে কিন্তু কেউ হারাতে পারবে না। রেডিওকে হারানো যায় না।”
সামান্য থেমে আরও বললেন, “দেখুন, সভ্যতার নিয়ম মেনে রেডিও শোনার পাশাপাশি এখন দেখাও যায়। আমার কিছু বলার নেই এই বিষয়ে। ভাল-মন্দ বলব না কিছুই। শুধু এটুকু বলব, যুগের নিয়মে, যুগের প্রয়োজনে রেডিওর এই অবতার হয়েছে। আসলে আমরা যতই শুনি, সঙ্গে তো একটু দেখতেও চাই। তাই হয়ত... দেখুন, রেডিও হল থিয়েটার অফ মাইন্ড। অথবা আর্ট অফ ইমাজিন্যাশনও বলতে পারেন। আমি আর একটা কথা বলব, রেডিও নাটক লেখার বিষয়ে কিন্তু সাহিত্যিকদের একটু ভাবা উচিত। স্যামুয়েল বেকেট-এর মতো নোবেলজয়ী নাট্যকার-সাহিত্যিকের পর্যন্ত রেডিও নাটক আছে। রেডিও আজকের দিনে এইটুকুই আমার প্রার্থনা...”
ছয় ও সাতের দশক জুড়ে আকাশবাণীতে কাজ করেছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। রেডিও নিয়ে জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাস রেডিওওয়ালা-ওর ও স্রষ্টা তিনি। আজকাল ডট ইন-কে স্বপ্নময় বললেন, “দীর্ঘ দিন ধরেই রেডিওতে কাজ করেছি বলেই যে রেডিওর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারব, এমনটা মোটেই নয়। বরং বলি, এক জায়গায় থাকা রেডিওকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারছি -এই যে ট্রান্সফর্মেশন...এই ব্যাপারটাই আমার কাছে দারুণ আশ্চর্যের ছিল। ক্রমশ আশ্চর্য হওয়াটা বাড়তে লাগল তবে এআই এসে যাওয়ার পর আর আশ্চর্য হই না। এখন আশ্চর্য হওয়া মানে বোকামি! যাক, যে কথা বলছিলাম... জানেন, এখনও রেডিও যন্ত্রটার অস্তিত্ব আছে কিন্তু রেডিও ঠিক করবার লোক আর পাওয়া যায় না। এই প্রসঙ্গে টেপ রেকর্ডারের কথা বলা যায়। যন্ত্রটা তো একপ্রকার লুপ্ত-ই হয়ে গিয়েছে! জন রেডিওতে কাজ করেছি, ভাবতেই পারিনি একদিন টেপ রেকর্ডার উঠে যাবে। আর একটা কথা বলতে চাই, ১৯২৭ সাল থেকে ছয়ের দশক পর্যন্ত কত অমূল্য সব প্রোগ্রাম হয়েছিল তা কিন্তু রেকর্ড করা হয়নি। কোনও আর্কাইভ করা হয়নি! কারণ তখন সবকিছু লাইভ ছিল। যা কিছু হতো, হাওয়ায় ভেসে যেত।”
&t=313s
“দেখুন, আগেকার অনেককিছুই তো আর এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়, রেডিও-ও ঠিক তেমন। তবু চলছে। আমাদের সময় আকাশবাণীতে যতজন চাকরি করতেন, তার দশ ভাগের এক ভাগও এখন চাকরি করে না। তবু চলছে। সব বাড়িতে যেমন মিক্সি থাকলেও আজও একটা শিল নোড়া থাকে, রেডিও ঠিক তাই। আজ রেডিওর ব্যাপার স্যাপারের অনেকটাই ইউটিউবে চলে এলেও, রেডিও শোনার কিন্তু খুব ঘাটতি হচ্ছে না। যাঁদের শোনার, তাঁরা শোনেন। তবে হয়নি, আমার মতে না দেখা গেলেই ভাল হত। যাক, কী আর করা যাবে। আর একটা ব্যাপার হল, যাঁরা সংস্কৃতিপ্রেমী তাঁরা কিন্তু প্রায় স্বেচ্ছাশ্রম দেন রেডিওকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কম টাকায় তাঁরা চাকরি করেন, স্রেফ রেডিওকে বাঁচিয়ে রাখবে বলে। আজকের দিনে, ওঁদের কথা বলাটা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
