ইরফান খান—যাঁকে অকালে হারানোর যন্ত্রণা আজও চলচ্চিত্রের আকাশে এক বিশাল শূন্যতা হয়ে বিঁধে আছে। আজ ২৯ এপ্রিল, তাঁর ষষ্ঠ প্রয়াণ বার্ষিকী। ২০২০ সালের এই বিষাদময় দিনেই ৫৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন রুপালি পর্দার এই জাদুকর। কিন্তু ইরফান মানে তো কেবল রক্ত-মাংসের শরীর নয়, ইরফান মানে এক দর্শন। প্রয়াণ দিবসে তাঁর সেই গভীর জীবনবোধের কথা আরও একবার মনে করা যাক। 

 

 

আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে এক নিস্তব্ধ দুপুরে চিরবিদায় নিয়েছিলেন ইরফান খান। নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমারের বিরুদ্ধে অসম লড়াই শেষ হয়েছিল তাঁর। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন কিছু চরিত্র এবং এমন কিছু শব্দ, যা আজও পথ হারানো মানুষের ধ্রুবতারা হয়ে কাজ করে। সম্প্রতি তাঁর একটি পুরনো সাক্ষাৎকার সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে জীবনের বয়স এবং পরিকল্পনার অসারতা নিয়ে অকপট ছিলেন তিনি।


একবার এক সাক্ষাৎকারে ইরফানকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ৫০ বছর বয়স হওয়া কি তাঁকে আরও জ্ঞানী করে তুলেছে? উত্তরে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় হেসে ইরফান বলেছিলেন, “বয়স গোনার এই নেশাটা আমি ঠিক বুঝি না। বয়সের সঙ্গে জ্ঞানের কোনও সম্পর্ক নেই। সবটাই নির্ভর করে আপনি কেমন জীবন অতিবাহিত করছেন তার ওপর।”তিনি আরও যোগ করেছিলেন, “মাঝে মাঝে আমি এমন শিশুদের সঙ্গে দেখা করি যারা আমার থেকেও অনেক বেশি জ্ঞানী। এটা পুরোটাই এক্সপোজার এবং আপনার মানসিক প্রবণতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি পর্যবেক্ষক হন, তবেই আপনি বিকশিত হবেন।”


সফল মানুষেরা যখন পরিকল্পনা বা ‘প্ল্যানিং’-এর ওপর জোর দেন, ইরফান তখন হেঁটেছিলেন উল্টো পথে। তিনি বলেছিলেন, “আমি একসময় অনেক পরিকল্পনা করতাম, কিন্তু আমার কোনও পরিকল্পনাই কোনোদিন কাজে আসেনি। জীবন আমাকে বারবার সিগন্যাল দিয়েছে— ‘প্ল্যান করো না, আমি নিজেই দেখে নেব তোমার প্ল্যান যেন সফল না হয়!’ আমি খুব অল্প বয়সেই সেই শিক্ষা পেয়েছিলাম। আমি যদি দু’মাসের পরিকল্পনাও করি, তবে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।”


গ্ল্যামার জগতের তারকাদের বড় ভয় থাকে বার্ধক্যে সৌন্দর্য হারানো নিয়ে। কিন্তু ইরফানের ভয় ছিল অন্য জায়গায়। তিনি ভয় পেতেন ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ বন্ধ হয়ে যাওয়াকে। উডি অ্যালেন বা ক্লিন্ট ইস্টউড-এর উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন, “তাঁরা যেভাবে বুড়ো হয়েছেন, সেটা এক কথায় ‘অপূর্ব’! বয়স বাড়লেও তাঁদের মধ্যে নতুন কিছু অন্বেষণের খিদে মরে যায়নি। নিজের সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলাটাই হলো একজন অভিনেতার কাছে সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি এবং ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।”


ইরফান তাঁর কেরিয়ার শুরু করেছিলেন খ্যাতি আর অর্থের নেশায়, কিন্তু পরে অভিনয়ের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিলেন বেঁচে থাকার সার্থকতা। আজ তাঁর ষষ্ঠ প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে উপভোগ করা এবং স্রোতে ভাসাটাই আসল শিল্প।