- কেউ ভাল রুমালি রুটি বানান, কেউ ভাল কষা মাংস রাঁধেন আবার কেউ ভাল সঙ্গীত করেন।
- ভারতবর্ষ সকলের দেশ, কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়!
- কে জন লেনন? সুযোগ পেলে মানুষের সঙ্গে পথে দাঁড়িয়ে কোরাস গাইব!
কবীর সুমন মানেই একরাশ আবেগ, গান আর বিপ্লবের উদ্যাপন। দেখতে দেখতে সেই কবীর সুমন আজ ৭৭! ভাবা যায়। আশি ছুঁইছুঁই বয়সের চৌকাঠে এসেও ‘জীবন এখনও আমার কাছে ভীষণ ইন্টারেস্টিং’ বলা বাংলার অন্যতম খ্যাতনামা এই সঙ্গীতশিল্পীর মুখেই মানায়। তিনি যে ব্যক্তির থেকে বেশির সমষ্টির, তা যেন নিজের জন্মদিনে নতুনভাবে প্রমাণ করলেন ‘গানওলা’।
জন্মদিনের দিন সাক্ষাৎকারে দিচ্ছেন। শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জানিয়েই শুরু করি।
কবীর সুমন: অনেক ধন্যবাদ। আর আপনাকে আমি বহুদিন ধরেই চিনি... তবু আরও একবার আমার ভালবাসা নেবেন। সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকবেন (হাসি)।
প্রচুর অনুরাগীরা নিশ্চয়ই ফোন করে শুভেচ্ছাবার্তা দিচ্ছেন?
কবীর সুমন: হ্যাঁ, করছেন। ঠিক আছে...কিন্তু বেশি ভাল লাগে না। আমার কাছের মানুষেরা এসেছেন, নাতি এসেছেন। নাতি মানে আমার দাদার ছোট মেয়ের ছেলে। তাঁদের সঙ্গে জুত করে গল্প-আড্ডা দিচ্ছি, তার মাঝখানে এত ফোন আর ভাল লাগে না। সে তার ছোটদাদুর সঙ্গে গল্প করতে এসেছে আর সেটাই তো হচ্ছে না। ধুর!
আচ্ছা, সারা জীবনে এত গান লিখেছেন। আপনার থেকেই জানতে পেরেছি কখনও এইসব গানের কোনওটির সুর অথবা কথা মাঝরাতে এসেছে। কখনও বা লোডশেডিংয়ে বন্ধ ঘরে আটকে থাকার সময়েও। আপনার তখনকার গিটারটা অথবা পিয়ানোটা যদি কথা বলতে পারত, তবে আপনার সেই মাঝরাতের সুর তৈরির কোন গোপন অভ্যেসটা সে ফাঁস করে দিত?
সুমন: অভ্যাস...হ্যাঁ অভ্যাস-ই বটে। ব্যাপারটা হল চর্চা। প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হবে। এটা কিন্তু একটা কাজ। এর মধ্যে কোনও অনুপ্রেরণা নেই, ঐশী হস্তক্ষেপ নেই, কিচ্ছু নেই। এটা কাজ! দেখুন, কেউ ভাল রুমালি রুটি বানান, কেউ ভাল কষা মাংস রাঁধেন আবার কেউ ভাল সঙ্গীত করেন। এইটুকুই।

৭৮-এ পা রেখেছেন। সারাজীবন তোয়াক্কা না করেই চিরাচরিত বহু নিয়ম হেলায় ভেঙেছেন। এই বয়সে এসে এমন কোনও নিয়ম কি বাকি আছে যেটা আপনি এখনও ভাঙেননি কিন্তু এই বছর ভাঙার পরিকল্পনা এঁটেছেন?
কবীর সুমন: এই রে! না সেরকম কিছু...(বলতে বলতে হাসি) না সত্যিই তেমন কোনও পরিকল্পনা নেই।
আজীবন ভালবাসার কথা বলেছেন নিজের গানে, লেখায়। ভালবাসার প্রতি আপনার বিশ্বাস আজও অটুট। তবে এখন চারপাশ জুড়ে এই অস্থির সময়ে কলকাতার, আমাদের দেশের ভালবাসার চরিত্রও কি খানিক বদলে গিয়েছে?
কবীর সুমন: দেখুন, কলকাতাকে আমি ভালবাসি। এই শহরে আমি বড় হয়েছি। আশা করি, এই শহরের মাটিতেই আমাকে দাফন করা হবে। সত্যি কথা বলতে কী কলকাতার থেকে বেশি আর কাউকে এ জীবনে আমি বেশি ভালবাসিনি! আমি আরেকটা কথা বলতে চাই।
নিশ্চয়ই! বলুন না।
কবীর সুমন: ভারতের স্পিরিটটাকে আমি ভালবাসি। দারুণ ভালবাসি! কিন্তু এই স্পিরিটটার খোঁজ খব কম লোক-ই রাখে। কেমন? এই দেশটি কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, এই দেশ কোনও রাজনৈতিক দলেরও নয়, কোনও ধর্মেরও নয়। ভারতবর্ষ সকলের দেশ (জোর গলায়)। আর সেই ব্যাপারটা কিন্তু এই দেশ থেকে থেকেই প্রমাণ করেছে, এখনও করছে এবং আগামীতেও করবে! আমি এই ভারতের আত্মাটাকে ভালবাসি।
বাংলা ভাষা নিয়ে আপনি সারাজীবন খেলেছেন, লালন করেছেন। আজকের এই হিজিবিজি সময় দাঁড়িয়ে আমাদের এই দেশকে এবং শহর কলকাতাকে বর্ণনা করার জন্য কোন একটা বাংলা শব্দ ব্যবহার করবেন?
কবীর সুমন: কলকাতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলাদা কোনও শব্দ প্রয়োগ করব না। কলকাতাকে বোঝাতে গেলে স্রেফ কলকাতা বলাটাই যথেষ্ট। আরআমাদের দেশকে নিয়ে... আসলে, এই দেশটাকে আমি না আর চিনতে পারি না। যে ভারতটাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি, তাকে আজকাল আর আমি চিনতে পারি না! যেমন ধরুন, অল্প বয়সে দিল্লিতে গিয়ে দেখেছি-শুনেছি সেখানে সকলেই সকলকে ‘জনাব’ বলে সম্বোধন করছেন। পাল্টা প্রত্যুত্তর আসছে ‘জ্বী জনাব’। এবার এই 'জনাব' শব্দটি তো শুধু মুসলিম সংস্কৃতির ব্যাপার নয়। হিন্দুরাও অক্লেশে বলতেন এবং এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। আর এখন? বলতে চাইছি ধর্ম নিয়ে আমাদের দেশে এই যে এখন এত মাতামাতি, এত আধিক্য...এই আধিক্যর জন্যেই এখন দেশটাকে ‘বোকা ভারত’ বলব! যে ভারত তার স্বাভাবিক মহত্ব ও ঔদার্য ভুলে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করে তাকে বোকা ভারত ছাড়া আর কী-ই বা বলব!

শেষ প্রশ্ন। একটু হাইপোথ্যাটিক্যাল। সুস্থতা বা দীর্ঘায়ু নয়, আজ যদি একদম একটা 'অন্যরকম' কোনও আবদার পূরণ হওয়ার সুযোগ আসে কবীর সুমনের কাছে — যেমন জন লেননের সঙ্গে ডুয়েট অথবা গড়িয়াহাট মোড়ে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে গান গাওয়া। আপনি কোনটা চাইবেন?
কবীর সুমন: কে? কে জন লেনন? (জোর গলায়) জন লেনন কি আমাকে চিনতেন? অথবা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মণকে চিনতেন? হোয়াই শুড বি আই কিউরিয়াস অ্যাবাউট জন লেনন? ওঁকে নিয়ে সাহেবরা ভাবুক! আব্দুল আলীমকে চিনতেন জন লেনন? কে উনি এমন হরিদাস পাল যে ওঁর সঙ্গে গান গাইতে যাব? স্রেফ সাহেব বলে রবিশঙ্করের শিষ্য হয়ে যেতে পারলেন! নিজের দেশের ক'জনকে শিখিয়েছেন রবিশঙ্কর? সোজা কথা বলছি! (জোর গলায়) কাজেই আমি সুযোগ পেলে মানুষের সঙ্গে কোরাস গাইব। একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইব! হাজারবার আমাকে বাছতে বলা হলে এটাই বাছব।
