আমির খানের সিনেমা মানেই শুধু বিনোদন নয়, বরং তাকে সমাজের সঙ্গে এক নিবিড় কথোপকথন বলা চলে। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক মুক্তি ‘সিতারে জমিন পার’ যেন সেই কথোপকথনকে একেবারে বাস্তব পরিবর্তনের জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। প্রায় ১৮ বছর আগে ‘তারে জমিন পার’ সমাজের চোখ ফেরাল ডিসলেক্সিয়া ও নিউরোডাইভারজেন্ট শিশুদের দিকে। আর এবার তার আধ্যাত্মিক সিক্যুয়েল ‘সিতারে জমিন পার’ নতুন করে নাড়া দিল সমাজকে, এমনকী দেশের বিচারব্যবস্থাকেও!

 


সম্প্রতি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে করা কিছু ঝাঁঝালো কৌতুকমূলক মন্তব্যের ভিডিওকে কেন্দ্র করে সুপ্রিম কোর্ট কড়া অবস্থান নেয়। ওই ঘটনায় স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান ও ইনফ্লুয়েন্সার সময় রায়না-সহ আরও চারজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারকে একটি উল্লেখযোগ্য নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে বলা হয়েছে, তাঁরা মাসে অন্তত দু’বার তাঁদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও জনসমক্ষে অনুষ্ঠানগুলিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাবেন। উল্লেখ্য, ‘সিতারে জমিন পার’ ছবিতেও আমিরের চরিত্রটির জন্য খানিক এরকম নির্দেশ-ই বহাল করেছিল আদালত। 

 

আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধুই ক্ষমা বা প্রতীকী শাস্তি নয়,  বরং অসংবেদনশীলতাকে বদলে দীর্ঘস্থায়ী সচেতনতা ও গঠনমূলক সামাজিক সংলাপ তৈরি করা। পাশাপাশি এই ইনফ্লুয়েন্সারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন, লড়াই ও বাস্তব সমস্যাগুলি তুলে ধরার। এমনকী, স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (SMA)-এর মতো বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য তাঁদের তহবিল সংগ্রহের কথাও বলা হয়েছে।

 

এই রায় এমন এক সময়ে এল, যখন ‘সিতারে জমিন পার’ দেশজুড়ে প্রতিবন্ধকতা, অন্তর্ভুক্তি, মর্যাদা ও দৃশ্যমানতা নিয়ে আলোচনাকে নতুন করে উস্কে দিচ্ছে। ‘তারে জমিন পার’ যেখানে এক শিক্ষকের চোখ দিয়ে একটি শিশুর ডিসলেক্সিয়া বোঝার গল্প বলেছিল, সেখানে ‘সিতারে জমিন পার’ সেই পরিসরকে বিস্তৃত করে সমাজের বৃহত্তর দায়িত্বের প্রশ্ন তোলে।

 

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পর অনেকেই লক্ষ করেছেন,  ছবিটি ইতিমধ্যেই ঘরে, স্কুলে, কর্মক্ষেত্রে এই বিষয়গুলিকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যেন আবারও মনে করিয়ে দিল, সিনেমা চাইলে সমাজকে আত্মপরীক্ষার জায়গায় দাঁড় করাতেও পারে।

 

প্রসঙ্গত, আমির খান প্রোডাকশনস নিবেদিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন দশজন নবীন শিল্পী।  আরুশ দত্ত, গোপী কৃষ্ণ ভার্মা, সময়িত দেশাই, বেদান্ত শর্মা, আয়ুষ ভানসালি, আশিস পেন্দসে, ঋষি শাহানি, ঋষভ জৈন, নমন মিশ্র ও সিমরন মাঙ্গেশকর। এই নবাগত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রত্যেকেই বিশেষ  বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন। তবুও বড়পর্দায় তাঁদের অভিনয় ইতিমধ্যেই স্বতঃস্ফূর্ততা ও আবেগের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছে। ছবির পরিচালনায় দায়িত্বে ছিলেন আর. এস. প্রসন্ন, যিনি আগে ‘শুভ মঙ্গল সাবধান’-এর মতো সামাজিক ট্যাবু ভাঙা ছবি বানিয়েছেন। ‘সিতারে জমিন পার’ তাঁর সবচেয়ে বড় ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজেক্ট বলে মনে করছেন অনেকে। হাসি, আবেগ আর মানবিকতার মেলবন্ধনে ছবি জমিয়ে রেখেছে আমির খান প্রোডাকশনসের সামাজিক দায়বদ্ধতার ঐতিহ্য।

 

ছবিতে মুখ্যভূমিকায় দেখা গিয়েছে আমির খান ও জেনেলিয়া দেশমুখ-কে। সঙ্গীতে শঙ্কর-এহসান-লয়, গীতিকার অমিতাভ ভট্টাচার্য। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন দিব্য নিধি শর্মা। প্রযোজনায় আমির খান ও অপর্ণা পুরোহিত, সঙ্গে বি. শ্রিনিবাস রাও ও রবি ভাগচান্ডকা। ২০ জুন, ২০২৫ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘সিতারে জমিন পার’।


যদি ‘তারে জমিন পার’ সচেতনতা তৈরি করে থাকে, তবে ‘সিতারে জমিন পার’ নীতিনির্ধারণের স্তরেও প্রভাব ফেলছে। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ সিনেমা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আইনি হস্তক্ষেপ-এই তিনের এক বিরল সংযোগের উদাহরণ। প্রতিবন্ধকতা ও অন্তর্ভুক্তিকে নতুন চোখে দেখার পথে ‘সিতারে জমিন পার’ আজ শুধু একটি ছবি নয়, এক সাংস্কৃতিক মাইলফলক।