বিগত কিছু মাস যাবৎ, বা বলা উচিত বিগত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট অভিনেতার ছবির সঙ্গে অন্য যে ছবি মুক্তি পাচ্ছে তাকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করছে সেই অভিনেতার ভক্তরা। কখনও কখনও তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, পরিবার নিয়ে আক্রমণের পর্যায় চলে যাচ্ছে। বাদ যাচ্ছে না হুমকিও। এই বিষয়ে প্রথমে একটি মিটিং করার পর, ২ জানুয়ারি, শুক্রবার দুপুরে কলকাতার নগরপালের সঙ্গে দেখা করেন টলিউডের পরিচিত মুখেরা। তাঁদের মধ্যে ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস থেকে শুরু করে পরিচালক, প্রযোজক সকলেই ছিলেন। 

কেন এবং কী কী বিষয় নগরপালের সঙ্গে কথা বলবেন এবং অভিযোগ জানাবেন সেটা জানিয়ে স্বরূপ বিশ্বাস বলেন, "কখনও আমাদের রিলস, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, বিভিন্ন ভাবে আমাদের কলাকুশলী, শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজক সবাইকে যেভাবে হেনস্থা, অপমান, ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হচ্ছে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে, এগুলোর জন্য ওঁর সঙ্গে আমরা কথা বলতে চাই। আমরা একটা লিখিত আবেদন নিয়ে এসেছি। আমরা এতে সবাই সই করে জমা করব। পুলিশের উপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে, আশা রাখব ওঁরা সঠিক ব্যবস্থা নেবেন।" 
নগরপালের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসভিএফের তরফে প্রযোজক শ্রীকান্ত মোহতা বলেন, "উনি যতটা সাহায্য করতে পারবেন করবেন বলে জানিয়েছেন। আমরা খুব সন্তুষ্ট।" প্রায় একই জবাব শোনা যায় সুরিন্দর ফিল্মসের তরফে প্রযোজক নিসপাল সিং রানের গলাতেও। তিনি একই সঙ্গে এদিন এও জানান, "আমার মনে হয় ভবিষ্যতে এগুলো বন্ধ হওয়া এবং ইন্ডাস্ট্রি সঠিক ভাবে চলা উচিত।"

তবে রানা সরকার কোনও রাখঢাক না রেখেই এই বিষয়ে সাফ সাফ জানান, "বারবার এটা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। এর আগে উইন্ডোজের জিনিয়া সেনের উপর একটা আক্রমণ হয়েছিল, তখন পুলিশে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। আবার এই বছর পুজোর সময়, এখন...। প্রতিটি সিনেমা রিলিজের আগে কাউকে যেন আক্রমণ, সম্মানহানি না করা হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে। কেউ কারও মতামত ব্যক্ত করতে পারেন, আমাদের দেশে বাকস্বাধীনতা আছে। কিন্তু সংগঠিত বা ষড়যন্ত্র করে কেউ কিছু করছে কিনা এটা আমাদের মনে একটা সন্দেহ এসেছিল স্ক্রিনিং কমিটিতে আমরা যেটা আলোচনা করেছিলাম, সেটার তদন্তের জন্য এসেছি। আমরা জানি না কেউ আদৌ করেছে কিনা, নাও করে থাকতে পারে। কিন্তু এটার তদন্ত হওয়া উচিত। সামাজিক দূষণ, কারও ছবি এআই দিয়ে মর্ফ করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সমাজমাধ্যমে এই অভ্যাস বন্ধ হওয়া দরকার। পুলিশ এটা খতিয়ে দেখবে, তারপর ব্যবস্থা নেবে।"

অভিনেতা, পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও এদিন নগরপালের সঙ্গে দেখা করেন বাকিদের সঙ্গে। তিনি সেই সাক্ষাতের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, "মত প্রকাশের স্বাধীনতা একটা জিনিস, আর কোনও মানুষকে, কোনও একটা নির্দিষ্ট ছবিকে, তার কলাকুশলীদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করা সেটা আলাদা জিনিস। সরু হলেও দুটোর মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। সেই রেখাটা বারবার লঙ্ঘিত হতে দেখা যাচ্ছে। সেটার জন্য কলকাতা পুলিশ কীভাবে আমাদের সাহায্য করতে পারে, ব্যক্তিগত আক্রমণ থ্রেট করা এগুলো যাতে না হয়, সেটার প্রয়োজন আমি অনুভব করেছি বলে আজ এখানে এসেছি।" হাজির ছিলেন অভিনেতা যিশু সেনগুপ্ত, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তও। সঙ্গীত পরিচালক, তথা গৃহপ্রবেশ ছবির পরিচালকের কথায়, "কারও কোনও ক্ষতি না করে এই ব্যক্তি আক্রমণ কী করে বন্ধ করা যায় সেটা আলোচনা করতে এসেছিলাম নগরপালের সঙ্গে। পয়েন্ট নোট করে শুনেছেন।" 

স্বরূপ-যিশু-পরমব্রত-রানা-পিয়াদের সই করা অভিযোগ

গত স্ক্রিনিং কমিটির মিটিংয়ে হাজির ছিলেন না দেব। চলতি বছরের পুজোর সময় 'রঘু ডাকাত' মুক্তি পাওয়ার পর দেবের অনুরাগীরা 'রক্তবীজ ২' ছবিটিকে কটাক্ষ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়। সমাজমাধ্যমে এই বিতর্কে জড়াতে দেখা যায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সহ নানা পরিচিত মুখকেও। গত বছর পুজোর সময়ও ঘটেছিল একই ঘটনা। তবে কি এই অভিযোগ প্রকারান্তরে দেবের বিরুদ্ধেই? প্রশ্ন শুনেই ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের জবাব, "অনেকেই বিষয়টা এমন ভাবে দেখাচ্ছেন তাতে মনে হচ্ছে যেন উনি আমাদের বিরোধী। এরম কোনও ঘটনা নেই। আগামী দিনেও এমন কোনও দুর্ঘটনা ঘটবে না।" তবে স্বরূপ বিশ্বাস যাই বলুন, রানা সরকারের কথায়, "কে ভুল কে ঠিক আমরা জানি না। কে করছে সেটাও জানি না। এবার পুলিশই বলতে পারবে যে কেন হচ্ছে আর কারা করছে।" 

নগরপালের সঙ্গে এই বৈঠকে টলিউডের তরফে উপস্থিত ছিল ফেডারেশন, ইম্পা, অভিনেতা এবং প্রযোজকদের প্রতিনিধিরা। ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস, নিসপাল সিং রানে, ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, যিশু সেনগুপ্ত, শ্রীকান্ত মোহতা, রানা সরকার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, পিয়া সেনগুপ্ত। তবে তাঁদের তরফে যে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়েছে সেখানে এঁরা ছাড়াও সই করেছেন, আবির চট্টোপাধ্যায়, কৌশানি মুখোপাধ্যায়, বনি সেনগুপ্ত, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, জিনিয়া সেন, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, সহ মোট ১৮ জন। এই অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতা পুলিশ এখন কোন ব্যবস্থা নেয়, তদন্ত কোন পথে এগোয়, সেইদিকেই নজর থাকবে সবার।