গরম বাড়ছে সেইসঙ্গে বঙ্গে বাড়ছে ভোটের উত্তাপ। রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষ সকলেই বলছেন ২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন হতে পারে 'গেমচেঞ্জার'। '২৬-এর লড়াইতে শাসকদল তৃণমূল আবারও ভরসা রেখেছেন মিতভাষী শিল্পী অদিতি মুন্সীর উপর। রাজারহাট গোপালপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অদিতি মুন্সী৷ ২০২১ সালের মতোই কি এবার তৃণমূলকে জয়পতাকা উপহার দেবেন অদিতি? ভক্তিগীতির সঙ্গে রাজনীতির মেলবন্ধন কি হয়? ব্যক্তিজীবন থেকে রাজনীতি সব নিয়েই আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় অদিতি মুন্সী। শুনলেন সায়নী মুখার্জি।

প্রশ্ন: রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যকারণ কী?
অদিতি: মানুষ আমাকে সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে প্রচুর ভালবাসা দিয়েছেন৷ তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ৷ গান ছাড়া আমার একার পক্ষে বহু মানুষের জন্য কিছু করা তো সম্ভব ছিল না। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, ছোটখাটো কিছু কাজ করতাম৷ কিন্তু, আমার এলাকার জন্য কিছু কাজ করতে পারাটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল৷ আমিও যে এলাকায় যে সমস্যার মধ্যে পড়ছি আমার পাশের বাড়ির মানুষও সেই অসুবিধা ভোগ করছেন। যখন আমার কাছে রাজনীতিতে আসার সুযোগ হল, আমার মনে হয়েছিল একটা চেষ্টা করা যাক আদতে আমি কতটা কী করতে পারি! রাজনীতি মানেই খারাপ তেমনটা তো নয়৷
প্রশ্ন: যখন রাজনীতিতে এসেছিলেন তখন আপনার কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী ছিল? এই সময় আপনার কেন্দ্রে কোন কোন সমস্যা আছে?
অদিতি: ২০২১ সালে যখন আমি রাজনীতিতে আসি তখন জল জমার কিছু সমস্যা ছিল৷ আমি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে জানিয়েছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই পদক্ষেপ করেন৷ আমাদের বিধানসভার চারিদিকে প্রচুর খাল রয়েছে৷ এর ফলে এই অঞ্চলে জল জমার প্রবণতা ছিল৷ ২০২১ সালে মুখ্যমন্ত্রীকে বলার পরে তিনি খালগুলো ড্রেজিং করার ব্যবস্থা করেন৷ খালগুলো ড্রেজিং করার ফলে তার জল ধারণ ক্ষমতা বেড়েছে তাই এখন জল জমার সমস্যা অনেকটাই কমে গিয়েছে তাছাড়া পাঁচটা পাম্পিং স্টেশন করা হয়েছে যাতে খুব তাড়াতাড়ি জল বের করে দেওয়া যায় | তবে কিছু টেকনিক্যাল এররও রয়েছে৷ যেমন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘনবসতি হয়েছে এলাকায়৷ ফলে যে নিকাশি ব্যবস্থায় হয়তো ১০ জনের জলধারণের ক্ষমতা ছিল এখন সেখানে বসবাস করেন ১০০ জন৷ এরফলে নিকাশি ব্যবস্থাকে একটু প্ল্যান করতে হবে ৷ এটা সময়সাপেক্ষ কাজ, কাজ শুরুও হয়েছে। আমি আশাবাদী আগামী দিনে আমাদের কাজের মাধ্যমে এই সমস্যা ১০০% নির্মূল হয়ে যাবে৷ আগে বৃষ্টি হলে তিন চারদিন কোথাও কোথাও এক সপ্তাহ জল দাঁড়িয়ে থাকত৷ এখন বৃষ্টি হলে সেখানে ৬-৭ ঘণ্টার মধ্যে জল নেমে যায়৷

প্রশ্ন: প্রচারের সময় সারাদিন কী কী খাচ্ছেন? কীভাবে নিজের যত্ন নিচ্ছেন?
অদিতি: কোনও যত্ন নিই না আলাদা করে৷ দিনের শুরু হয় চা খেয়ে৷ জলখাবারের কোনও ঠিক থাকে না, আমি ঘরের খাবারই পছন্দ করি৷ তবে এক আধদিন কচুরি হলেও মন্দ হয় না৷ গানবাজনা করা মানুষের রসবোধ বেশি হয়৷ আমাকে দেখে হয়তো খাদ্যরসিক মনে হয় না। পরিমাণে কম খাই কিন্তু আমি গুছিয়ে খাবার খেতে পছন্দ করি৷ দুপুরে ভাত, ডাল গরমের দিনে গন্ধরাজ লেবু আহা! সন্ধেবেলা আবার চা৷ চা যদিও সারাদিন৷ চা-টা খেয়ে যদি শরীরের আর কোনও খাবারের দরকার পড়ে তাহলে ঠিক আছে৷ রাতে খুব দেরি হয়ে গেলে ভাত খাই না, তখন রুটি খাই৷ মাছে ভাতে বাঙালি বলতে যা বোঝায় আমি তাই৷

প্রশ্ন: জেতার বিষয়ে কতটা আশাবাদী?
অদিতি: বিধানসভার প্রতিটা মানুষ দেখেছেন যে পাঁচ বছরে প্রত্যেকটা জায়গায় কী পরিমাণ কাজ হয়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কী কী কাজ করেছেন সেটাও মানুষ জানেন৷ তাই শুধু জেতার বিষয় আশাবাদী বলব না, কতটা বেশি ব্যবধানে জেতা যায় সেই বিষয় আমরা অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি৷
প্রশ্ন: জিতলে প্রথম ১০০ দিনে আপনি কী কী কাজ করতে চান?
অদিতি: ১০০ দিন তো ওইভাবে বলা যায় না৷ তবে জিতলে আগামী দিনে যে যে কাজ করার পরিকল্পনা আছে, সেগুলো এখনই জানাতে চাইছি না৷ কারণ বিশেষ কিছু কাজ আছে যেগুলো আগে করব তারপর মানুষকে বলব৷ আমি বরাবর এই পন্থায় বিশ্বাস করি৷ ২০২১ সালেও আমি আগে থেকে এটা করব ওটা করব বলিনি৷ করার পরে ২০২৬ সালে বলছি বিগত পাঁচ বছরে কী কী কাজ হয়েছে। মানুষের ঘরে ঘরে কী কী সুবিধা পৌঁছে গিয়েছে, মানুষ দেখতে পাচ্ছেন৷ ২০২৬ সালে যদি আবার মানুষ আমাকে দায়িত্ব দেন আবারও আমি কজ করার চেষ্টা করব৷

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রী তো আপনার গানেরও ভক্ত, বিশেষ কোনও স্মৃতি আছে?
অদিতি: এটা আমার কাছে অত্যন্ত ভাললাগার যে মুখ্যমন্ত্রী কীর্তন গান পছন্দ করেন, এবং আমার গানও ভালবাসেন৷ যেখানে যখনই দেখা হয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই বলেন, অদিতি কেমন আছ? দ্বিতীয় কথা গান কেমন চলছে? একজন এত বড় মাপের মানুষ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তিনি আমার মতো সাধারণ মানুষকে আমার গানের কথা নাই জিজ্ঞাসা করতে পারেন৷ প্রতিটা মিটিংয়ে এটা জিজ্ঞাসা করা সম্ভবও না। কিন্তু উনি প্রতিটা মিটিংয়ে জিজ্ঞেস করেন৷ যখনই দেখা হয়, এত আন্তরিক ভাবে জানতে চান, মনে হয় যেন বাড়িরই কেউ জানতে চাইছেন। সবসময় বলেন রেওয়াজ কিন্তু চালিয়ে যেতে হবে৷ এই বিষয়গুলোই ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি ভালবাসা শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করে৷

প্রশ্ন: আপনার মতো মিতভাষী মিষ্টি স্বভাবের রাজনীতিবিদ বিরল - এটা কি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না কি বাড়তি সুবিধা দেয়?
অদিতি: সুবিধা দেয় কি না জানি না৷ তবে আমি অসুবিধায় পড়িনি৷ কারণ রাজনীতি মানে নিজেকে বদলে নিয়ে কিছু করতে হবে তেমন তো নয়৷ আমি সকলকেই বলি, আমি কেবল কিছু সুবিধা প্রদান করি, এর জন্যই আপনারা আমাকে মনোনীত করছেন৷ আমার কাজ সরকারের সরকারি প্রকল্প বা সরকার মানুষের জন্য যা যা করছেন সেই সমস্ত সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া৷ সেইসঙ্গে বিধানসভার মানুষের যা যা অসুবিধা সেটা সরকারকে জানিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করা। এই কাজটুকুই আমি করি৷ তার জন্য আমার মনে হয় না খুব আক্রমণাত্মক হওয়ার প্রয়োজন আছে৷ আমার সত্ত্বাটাতো শিল্পী সত্ত্বা৷ সেখানে অ্যাগ্রেশনের কোনও জায়গা নেই৷ আর ভালবেসে ভালভাবে যে কাজ হয় সেটা হিংসা বা কুৎসা করে করা যায় না৷
প্রশ্ন: তারকা প্রার্থী হওয়াটা কি বাড়তি সুবিধা দেয়, নাকি চাপ বাড়ায়?
অদিতি: আমি তারকা প্রার্থী নই৷ আমি এখানকারই মেয়ে৷ মানুষের ভালবসায় এই জায়গাটা পেয়েছি, মানুষ আমাকে চেনেন, এটা তো আশীর্বাদ।

প্রশ্ন: বাড়ির ছোট সদস্যটিকে সময় দিয়ে রাজনীতি, গান সব কিছু সামলাচ্ছেন, ব্যক্তিগত জীবন কতটা বদলেছে?
অদিতি: এখন অনেক বেশি এফর্ট দিতে হচ্ছে৷ অনেক পরিকল্পনা করতে হয় ঠিকই৷ কিন্তু এটাও ঠিক পরিবার ১০০ এর মধ্যে দুশো শতাংশ পাশে না থাকলে আমার একার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়৷ আমার বৃহত্তর পরিবার, সঙ্গীতজগতে আমার টিম এদের সহযোগিতা ছাড়া গান বা রাজনৈতিক ক্ষেত্র কোনও কিছুই ঠিক ভাবে করতে পারতাম না৷ আমার সব দিকে সব কাজ ঠিক মতো করার নেপথ্যে যে শুধুই আমার কৃতিত্ব আছে তা নয়, প্রতিটা মানুষ যাঁরা বিভিন্নভাবে আমাকে সহযোগিতা করছেন তাঁদের সকলের জন্য আমি পারছি৷

প্রশ্ন: নতুন প্রজন্ম কি রাজনীতি সচেতন, কী মনে হয়?
অদিতি: ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, দুটো ভাগ আছে। একদল যাঁরা বোঝেন, শিক্ষিত,মার্জিত৷ আরেকটা শ্রেণি যাঁরা যাচাই করতে ভুলে গিয়েছেন৷ যাঁদের হয়তো গ্রুমিংটা আরও একটু ভাল হলে হয়তো ভাল হত৷ যাঁদের হয়তো আরও একটু সহবৎ থাকলে ভাল হত৷ যাঁরা সচেতন তাঁরা কিন্তু আপনার আমার বলা কথাকে মানবেন না, যাচাই করবেন, সত্য মিথ্যা বুঝবেন। এটাই শিক্ষিত সমাজে হওয়া উচিত। পাশাপাশি আরেক শ্রেণির মানুষও আছেন যাঁরা বিচার বিশ্লেষণ না করে যা খুশি বলছেন। কোথায় কোন কথা বলব এটাও শেখা দরকার৷ এটা কেবল ডিগ্রি বা উচ্চশিক্ষার বিষয় নয়, অনেক মানুষ আছেন যাঁরা হয়তো পুঁথিগত শিক্ষায় ততটা শিক্ষিত নন কিন্তু ব্যবহারিক জ্ঞান তাঁদের অনেক বেশি৷
[অদিতি মুন্সীর ছবি সৌজন্য ফেসবুক]















