চলতি বছরের শুরুতেই নিজের নতুন ছবির নাম, পোস্টার ঘোষণা করেছিলেন পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্র।‘মায়ামৃগয়া’র-সাদা কালো পোস্টারে দেখা গিয়েছিল দুই নারীকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং জনৈক পুরুষ। শোনা গিয়েছে, ‘ব্ল্যাক অ্যান্ট হোয়াইট’ যুগের সময়ের মানুষদের কথা এই দুই রঙেই পর্দায় ফুটিয়ে তুলবেন শুভ্রজিৎ। চলতি বছরের শেষভাগে মুক্তি পাওয়ার কথা এই ছবির। তবে ‘মায়ামৃগয়া’-র কাজের ফাঁকেও ইতিহাসের খোঁজে ব্যস্ত রয়েছেন শুভ্রজিৎ। আসলে, পুরনো জিনিস সংগ্রহ করতে দারুণ ভালবাসেন তিনি, যে বস্তুটির সঙ্গে সরাসরি যোগ রয়েছে ইতিহাসের। সোজা কথায় এই পরিচালক একজন সংগ্রাহকও। 

পুরনো জিনিস সংগ্রহ নেশা তাঁর বহু বছর ধরেই।  দীর্ঘ বছরের তিল তিল করে সংগ্রহ করা তাঁর ভান্ডারে মজুত হয়েছে একাধিক দেশের প্রাচীন মুদ্রা - তার কোনওটির আলেকজেন্ডারের সময়কালের কোনওটি বা জুলিয়াস সিজারের! আবার তাঁর সংগ্রহে নাকি রয়েছে আব্রাহাম লিঙ্কনের হাতে লেখা চিঠিও, দাবি খোদ শুভ্রজিতের। নতুন ছবির কাজের ব্যস্ততার মাঝেও এই অদ্ভুত নেশা-ই বাঁচিয়ে রেখেছেন শুভ্রজিৎকে। ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রাচীন বস্তু সংগ্রহ করা—এই শখই যেন তাঁর আর এক পরিচয়। আর সেই নেশার টানেই এবার তাঁর সংগ্রহে যোগ হল কয়েকটি দুর্লভ প্রাচীন মুদ্রা, যার ইতিহাস পৌঁছে যায় খ্রিস্টপূর্ব যুগে।


সদ্য যেমন তিনি সংগ্রহ করেছেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলের তামার মুদ্রা যা ‘কার্স্যাপণ’ বলে পরিচিত ছিল সেই সময়ে। যে তামার মুদ্রার প্রচলন ছিল, আনুমানিক খ্রিস্টের জন্মেরও ৩০০ বছর আগে।

 

শুধু তাই নয়, ভারতীয় ইতিহাসের আরেক সম্রাট বিক্রমাদিত্যর পুত্র কুমারগুপ্তর আমলে প্রচলিত রুপোর মুদ্রাও কালেক্ট করেছেন তিনি।

 

এখানেই শেষ নয়, এই দু’টির সঙ্গে আরও একটি ‘অ্যান্টিক’ মুদ্রা সংগ্রহ করেছেন তিনি পুষ্যমিত্র শুঙ্গ (যিনি ভারতের মৌর্য বংশের সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে নিজের রাজত্ব শুরু করেছিলেন) প্রচলিত তাঁর রাজত্ব শুরুর প্রথম দিকের মুদ্রা। যে মুদ্রার প্রচলন ছিল  আনুমানিক খ্রিস্টের জন্মেরও ১৫০ বছর আগে।

 

 

আজকাল ডট ইন-কে হালকা মেজাজে শুভ্রজিৎ জানালেন, এই জিনিসগুলোর সবক'টি দিল্লি থেকে সংগ্রহ করা। সব নিয়মকানুন মেনে, কাগজপত্রে সইসাবুদ করেই। তাঁর কথায়, “ইতিহাস আমাকে বরাবর-ই টানে। কিছুদিন আগে চাণক্যকে নিয়ে একটু পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে মৌর্য বংশের ওই সময়টায় ডুবে গেলাম। এতটাই যে ওই সময়ের অনন্ত একটি জিনিস নিজের কাছে রাখার জন্য হাঁসফাঁস শুরু করে দিয়েছিলাম। এরপর খানাতল্লাশি শুরু করতেই সন্ধান পেলাম এসবের। দেখে আর দেরি করিনি। এর থেকেও আরও ভাল কিছু...আরও পুরোনো জিনিসের সন্ধান পেয়েছিলাম কিন্তু যা খরচ তাতে পোষাতে পারব না। অগত্যা...”

খানিক থেমে শুভ্রজিৎ ফের বলে ওঠেন, “অ্যান্টিক জিনিসকে শুধুই মেমেন্টো ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। আমি তো বলি, ইতিহাসের টুকরো যা দিয়ে অতীতকে স্পর্শ করা যায়। খানিক অনুভব করা যায়। এরকম হতেই পারে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলের যে মুদ্রাটি আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি তা হয়তো খোদ চন্দ্রগুপ্ত-ই খুশি হয়ে তাঁর কোনও সৈনিককে দিয়েছিলেন। কিংবা এও হতে পারে চাণক্য নিজে হাতে পুরস্কৃত করেছিলেন তাঁর কোনও গুপ্তচরকে! কে জানে, হতেই তো পারে।”


মজার বিষয়, ভবিষ্যতে নিজের কোনও ছবিতে প্রয়োজনে এই অ্যান্টিক জিনিস ব্যবহার করতেও আপত্তি নেই তাঁর। আগেও নিজের সংগ্রহ থেকে কিছু পুরনো বস্তু তিনি ব্যবহার করেছিলেন ‘দেবী চৌধুরাণী’ এবং ‘অভিযাত্রিক’ ছবির কাজে।
তবে এত কিছুর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত প্রিয় সংগ্রহ কোনটি? একটু ভেবে শুভ্রজিৎ জানান, সবকিছুর মধ্যেই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সেই প্রাচীন তামার মুদ্রা, যা একসময় ঘুরে বেড়াত সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের যুগে। ইতিহাসের সেই স্পর্শই যেন আজ তাঁর সংগ্রহের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।