কখনও তিনি ‘সোনার কেল্লা’-র হাড়হিম করা দুঃসাহসী খলনায়ক মন্দার বোস, কখনও বা নায়ক-এ উচ্চাকাঙ্ক্ষী, মধ্যবিত্ত কর্পোরেট বাঙালি প্রীতিশ সরকার। আবার ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ মগনলাল মেঘরাজ-এর প্রাইভেট সার্কাসের নাইফ থ্রোয়ার অর্জুন-ও তিনি-ই! তিনি, অভিনেতা কামু মুখোপাধ্যায়। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৯৫।
উত্তমকুমার-সুপ্রিয়া অভিনীত ‘সোনার হরিণ’ ছবিতে ছোট্ট একটি চরিত্রে কাজ করলেও, চলচ্চিত্র জগতে তাঁর প্রতিপত্তি-নাম ছড়ানো শুরু হয় সত্যজিতের ছবির সুবাদেই। ছোট্ট হোক অথবা বড়- সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে যেমন চরিত্রেই যখনই অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন। নিজস্ব দুর্নিবার ছন্দে তা উৎরে দিয়েছেন। চারুলতা থেকে সত্যজিতের ইউনিটে তাঁর নাম জুড়ে যাওয়ার পর থেকে তা আর খসানো যায়নি। এতটাই সত্যজিতের প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন কামু। ছবিতে তাঁর জন্য চরিত্র বরাদ্দ না থাকলেও ইউনিটে কামু নেই-তা ভাবতেই পারতেন না রায় পরিবার। প্রোডাকশনের কাজ থেকে শুটিংয়ের জোগাড়যন্ত্র করা, ভিড় সামলানো সবকিছুতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন কামু। আড্ডা আর দুষ্টুমিতে তো বটেই!
একটা ঘটনা বলা যাক। তখন জয়সলমীরে শুট চলছে ফেলুদার প্রথম ছবির। বেশ টাইট শিডিউল। পরদিন শুটিংয়ের কলটাইম ভোরবেলা। যথেষ্ট রাত হয়েছে। এমন সময় যে ঘরে সত্যজিৎ এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায় বিশ্রাম নিতেন, সেই ঘরের দরজায় কেউ কড়া নেড়ে ডাকলেন। সত্যজিৎ দরজা খুললেন। দেখলেন, ছবির এক অভিনেতা ইতস্তত করছেন। এরপর আমতা আমতা করে জানালেন, জয়সলমীর থেকে নিজের আত্মীয়দের জন্য নানান সাইজে যে সব'কটি নাগরা জুতো তিনি কিনেছিলেন, তা কেউ ‘ইয়ে’ করে দিয়েছে। ‘চুরি’ শব্দটি তাঁর মুখ থেকে বেরোয়নি। সত্যজিৎ বুঝলেন, ব্যাপার গুরুতর নইলে তাঁর কাছে ‘কমপ্লেন’ আসত না। কী মনে হতে তিনি কামুকে ডাকলেন।
কামু এলেন। জুতো ‘সরানো’র কথা শুনেই খানিক রেগে গেলেন। ছদ্ম-বিস্ময়ে জানালেন, জুতো তো সেই ভদ্রলোকের ঘরেই আছে। বলেই সত্যজিৎকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। গিয়ে তিনি দেখলেন, সেই সমস্ত জুতো ওই উঁচুতে ফ্যানের উপরে কী করে যেন ঝুলিয়ে রেখেছে কামু! 'অপরাধী'র দিকে তাকাতেই মুচকি হেসে সে বলল, “রাতের বেলা একবার পাখা চালালেই দেখিয়ে দিতাম নাগরা-ফলস কাকে বলে!”
কথার মারপ্যাঁচ জানতেন খুব। একবার সত্যজিতের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে খুব আড্ডা জমেছে। বিজয়া রায় চা দিয়েছেন, সঙ্গে বিস্কুট। ‘টা’ আসবে আরও কিছুক্ষণ পরে। তা বিস্কুট কামড় দিয়েই বিজয় রায়ের উদ্দেশে কামু বলে উঠলেন, “বিস্কুটগুলোয় কি সাইলেন্সার লাগিয়েছেন বৌদি?” শোনামাত্রই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন সত্যজিৎ-পত্নী, ততক্ষণে কামুর 'মানিকদা' কিন্তু হাসা শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বুঝেছিলেন কটাক্ষটা -বিস্কুটগুলো মিইয়ে গিয়েছিল, কুড়মুড়ে ভাবটা একেবারেই চলে গিয়েছিল। তা বুঝেই সাইলেন্সার শব্দটির মোক্ষম প্রয়োগ করেছিলেন কামু!
‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’, ‘হীরক রাজার দেশে’, শাখাপ্রশাখা -এর মতো সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কামু। পরবর্তী সময়ে সন্দীপ রায়ের পরিচালনাতেও ‘ফটিকচাঁদ’, 'গুপী বাঘা ফিরে এল' ছবিতে কাজ করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। সন্দীপ রায়ের প্রথম ছবি ‘ফটিকচাঁদ’-এ তো নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তাঁর 'ক্যামসন'। কামু মুখোপাধ্যায়কে ভালবেসে এই নামেই ডাকতেন সত্যজিৎ-পুত্র।















