ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ক্রাইম-থ্রিলার বা সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি সিরিজের জনপ্রিয়তা সবসময়ই আকাশছোঁয়া। সম্প্রতি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া পরিচালক প্রসিত রায়ের থ্রিলার সিরিজ ‘রাখ’ দর্শকদের মনে এক গভীর ও হাড়হিম করা প্রভাব ফেলেছে। সাতের দশকের শেষের দিকে পুরো ভারতকে স্তব্ধ করে দেওয়া দিল্লির কুখ্যাত ‘রঙ্গা-বিল্লা’ অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি হয়েছে এই সিরিজটি।
আলি ফজল, সোনালী বেন্দ্রে, আমির বশির এবং আকাশ মাখিজার মতো তারকাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ এই সিরিজটি যেমন দর্শকদের শিউরে তুলছে, তেমনই এই কুখ্যাত অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলিউড অভিনেতা ববি দেওল-এর এক রুদ্ধশ্বাস ও ব্যক্তিগত যোগসূত্র! গত বছর এক পডকাস্টে এসে ববি দেওল নিজের শৈশবের সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতির কথা প্রথমবার প্রকাশ্যে এনেছিলেন।
১৯৭৮ সালে ববি দেওল যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র, তখন দিল্লির দুই কুখ্যাত অপরাধী কুলজিৎ সিং (ওরফে রঙ্গ খুস) এবং জসবীর সিং (ওরফে বিল্লা)-এর আতঙ্কে কাঁপছিল গোটা দেশ। সেই সময়ের কথা মনে করে ববি জানান, ওঁর এক সহপাঠী তথা খুব কাছের বন্ধুকে এই রঙ্গা-বিল্লা গ্যাং অপহরণ করেছিল! কিন্তু এক অদ্ভুত বিভ্রান্তির কারণে ওঁর সেই বন্ধুটি অলৌকিকভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে বেঁচে ফিরে আসে।

ববি দেওল বলেন, “রঙ্গা-বিল্লা যতজনকে অপহরণ করেছিল, ওঁরদের মধ্যে আমার বন্ধুই ছিল সবচেয়ে ভাগ্যবান। এক অদ্ভুত কনফিউশনের কারণে ও ওঁরদের হাত থেকে জ্যান্ত পালিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু এই ঘটনার পর আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার বাবা (ধর্মেন্দ্র) এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন যে আমার বাড়ির বাইরে বের হওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
এই ঘটনার পর বলি তারকা ধর্মেন্দ্র ওঁর সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে এতটাই চিন্তিত হয়ে পড়েন যে ববির স্বাভাবিক শৈশবটাই বদলে যায়। ববি দেওলের কথায়, “স্কুল থেকে সোজা বাড়ি ফিরতাম, ব্যস ওইটুকুই। এমনকি আমি সাইকেল চালানো পর্যন্ত শিখেছিলাম আমাদের ঘরের ভেতরে! পরে যখন কলেজে উঠলাম এবং আমার বন্ধুরা হাউস পার্টির আয়োজন করা শুরু করল, তখনও আমাকে কোথাও যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না। আমার জন্য কড়া নিয়ম ছিল— রাত ৯টার মধ্যে যেকোনও মূল্যে বাড়ি ফিরতেই হবে।”
১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে নতুন দিল্লিতে গীতা চোপড়া এবং সঞ্জয় চোপড়া নামের দুই কিশোর ভাই-বোনকে নির্মমভাবে অপহরণ ও হত্যা করে রঙ্গা এবং বিল্লা। এই নৃশংস অপরাধের পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয় এবং পুলিশ এক বিশাল চিরুনি তল্লাশি অভিযান চালায়।
১৯৭৮ সালের ২৯শে আগস্ট দিল্লির রিজ ফরেস্ট এলাকা থেকে দুই ভাই-বোনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর, ৮ই সেপ্টেম্বর ধরা পড়ে দুই খুনি। ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার চলার পর অবশেষে ১৯৮২ সালে রঙ্গা এবং বিল্লাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই একটি ঘটনাই সে যুগের বাবা-মায়েদের মনে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে চিরকালের মতো এক গভীর আতঙ্ক তৈরি করে দিয়েছিল।
পরিচালক প্রসিত রায়ের এই ‘রাখ’ সিরিজটি মূলত সেই ১৯৭৮ সালের দিল্লির প্রেক্ষাপটেই তৈরি। তৎকালীন দিল্লির আইনশৃঙ্খলার অভাব, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং দুই কিশোরের মর্মান্তিক পরিণতিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আরিয়ান খানের ‘দ্য ব্যাড অ্যাস অফ বলিউড’ কিংবা সলমনের ‘কালা হিরণ’ ছবি নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই ওটিটি দুনিয়ায় এক অন্য মাত্রার টানটান উত্তেজনা তৈরি করেছে ‘রাখ’। আর ববি দেওলের এই রিয়েল-লাইফ স্বীকারোক্তি যেন সিরিজটির ভয়াবহতাকে দর্শকদের কাছে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলেছে।















