প্রয়াত জনপ্রিয় সাহিত্যিক মনিশংকর মুখোপাধ্যায়। পাঠকমহলে যিনি সমাদৃত ছিলেন শংকর নামেই। বয়স হয়েছিল ৯৪। গত বেশ কিছুদিন ধরেই বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন চৌরঙ্গী এ লেখক। শুক্রবার দুপুরে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখক। 

প্রসঙ্গত, সেই কবে ‘কত অজানারে’ দিয়ে তাঁর পথ চলা শুরু। তারপর গঙ্গা থেকে পদ্মা দিয়ে বয়ে গিয়েছে বহু জল। ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের জনপ্রিয়তা তাঁকে রাতারাতি যেমন বাঙালি পাঠকের ঘরের মানুষ করে  তুলেছিল তেমনই সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় তাঁর দু'টি উপন্যাস সীমাবদ্ধ এবং জন অরণ্য তাঁকে রাতারাতি আসমুদ্রহিমাচল ভারতের দর্শকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বলয়েও কাছেও পরিচিত নাম করে তুলেছিল। পরবর্তী সময় এই দু’টি উপন্যাস এবং ‘আশা আকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর ট্রিলজি, ‘স্বর্গ মর্ত পাতাল’।  ১৯৭১ সালের সত্যজিতের সেই ছবি ‘সীমাবদ্ধ’-এর প্রধান অভিনেতা ছিলেন বরুণ চন্দ। ছবিতে ‘শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জি’ নামের একজন উচ্চাভিলাষী সেলস ম্যানেজারের চরিত্রে বরুণ চন্দের অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক  চলচ্চিত্র মহলেও। সেই ছবিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর-ও। 

 

 

শংকর-এর প্রয়াণের পর আজকাল ডট ইন-কে বরুণ চন্দ বললেন, “মণি শংকর মুখোপাধ্যায়কে কখনও মণি শংকরবাবু অথবা মিঃ মুখার্জি বলে ডাকিনি। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কিন্তু ‘সীমাবদ্ধ’-র শুটিংয়ের বহু আগেই। সেই সময়ে আমি তখন একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করি। সেই সময় আমাদের অন্যতম মক্কেল ছিল ডানলপ সংস্থা। আর মণি শংকর বাবু ছিলেন ওই সংস্থার বিজ্ঞাপন ও জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ন্যাচারেলি, ওঁর কাছে আমাকে যেতেই হত তাই আমাদের আলাপ হতে খুব বেশিদিন লাগেনি।”

 

সামান্য থামলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা। এরপর ফের বলে উঠলেন, “জানেন তো, তখনকার দিনে অ্যানুয়াল রিপোর্ট বলে একটা খুব জরুরি বিষয় ছিল। অনেক সময় হয়েছে, সেই রিপোর্টের প্রতিটি পাতায় মণি শংকরবাবুর  স্বাক্ষর পাওয়ার জন্য ওঁর হাওড়ার বাড়িতে ছুটেছি। কারণ পুজোর উপন্যাস লেখার জন্য সংস্থা থেকে দিন সাত-আটকের ছুটি নিতেন। স্বভাবতই প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতেন লেখায়। তার মধ্যেই আমাকে সবকিছু বোঝাতাম। উনি শুনতেন, দেখতেন তারপর সই করে দিতেন। আর একটা ব্যাপার খুব ভাল করে মনে আছে। প্রতিবার ওঁর বাড়িতে গেলে এক ধরনের মিষ্টি খাওয়াতেন - নাম ‘নিখুঁতি’। ওঁর বাড়ির কাছেই পাওয়া যেত হাওড়ার বিখ্যাত সেই মিষ্টি।” 


“...এরপর যখন সীমাবদ্ধ ছবির শুটিংয়ের আগে দেখা হল, খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। মনে আছে, আমাকে দেখে বিস্ময় মেশানো রসিকতাকরে বলেছিলেন, ‘এ কী! তুমিই শেষমেশ আমার গল্পের নায়ক হয়ে গেলে।’ আমাকে উনি ‘তুমি’-ই বলতেন। তারপর উনি সিএসসি সংস্থায় জয়েন করলাম। আমি আপনাকে বলছি, পাবলিক রিলেশন ম্যানেজার হিসেবে এই ইন্ডাস্ট্রিতে ওঁর নাম শুনেই মানুষের শ্রদ্ধার উদ্রেক হত। আর  ওঁকে ভালবাসত-ও সবাই। পরবর্তী সময়ে উনি বোধহয় ডিরেক্টর-এর চেয়ারেও বসেছিলেন। আর একটা কথা বলি, যখন ওঁর বয়স বাড়ল এবং ঠিকমতো হাঁটতে অসুবিধে হতো তখন হুইল চেয়ার করেই বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে সম্মানগ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতেন মণি শংকরদা। একাধিকবার, ওঁর হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে গিয়েছি আমি। আমাকে দেখে ভীষণ খুশি হতেন। চোখেমুখে আলো ফুটে উঠত যেন। আসলে, পুরনো মানুষকে দেখলে যেমন হয় আর কী! ফিসফিস করে স্নেহমাখা সুরে বলে উঠতেন, 'আমার পাশে বসো। পাশেই বসো।’ আমি শুনতাম ওঁর কথা।” 

 

&t=313s


কথাশেষে সত্যজিতের নায়কের সংযোজন, “১৯৭১ সালে সীমাবদ্ধ মুক্তি পেয়েছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৭২ সালে সেই ছবি নিয়ে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল - কী করে সত্যজিতের নায়ক হলাম?' উনি কিন্তু মন দিয়ে লেখাটা পড়েছিলাম। তারপর একদিন আমার সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বলে উঠেছিলেন, ‘বরুণ, তুমি তো বেশ ভাল লেখো। তোমার বাংলা লেখার হাতটা কিন্তু মন্দ নয়।’ আমি তো অবাক! জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী করে জানলেন? ওঁর জবাবটা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে, ‘কেন তোমার লেখাটা তো আমি পড়েছি। মন দিয়ে পড়েছি। আরও লেখো। লেখা থামিও না কিন্তু তুমি...’ ” 

 

আজ বলি, লেখালিখির জন্য আমাকে প্রথম উৎসাহ কিন্তু দিয়েছিলেন মণি শংকরদা-ই। লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম ওঁর থেকেই।”