সুর হারিয়েছে ভারত। ৯২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলেন ‘মেলোডি কুইন’ আশা ভোঁসলে। মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আশীষ শেলার এই দুঃসংবাদ নিশ্চিত করেছেন। সোমবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত তাঁর দেহ শায়িত থাকবে তাঁর বাসভবনে, এরপর বিকেল ৪টেয় শিবাজি পার্কে সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য। 

 

আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দেশ। লতা মঙ্গেশকরের পর এবার আশা তাই-এর চলে যাওয়া যেন এক যুগের অবসান। এই অপূরণীয় ক্ষতিতে শোকপ্রকাশ করেছেন বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান। সমাজমাধ্যমে একটি হৃদয়স্পর্শী পোস্টের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন এই কিংবদন্তি গায়িকার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাদার সম্পর্কের গভীরতা।

 

 


শাহরুখ খানের সঙ্গে আশা ভোঁসলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত স্নেহের। প্রিয় 'আশা তাই'-এর প্রয়াণে শোকাতুর কিং খান সমাজমাধ্যমে একটি আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেছেন। শাহরুখ খান তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “আশা তাই-এর মৃত্যুর খবর শুনে সত্যি খুব খারাপ লাগছে... ওঁর কণ্ঠ ভারতীয় সিনেমার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল এবং আগামী কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে ওঁর সুর প্রতিধ্বনিত হবে।” আশার প্রতিভার প্রশংসা করে শাহরুখ আরও যোগ করেন, “এমন এক প্রতিভা যা চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি সবসময় আমায় আশীর্বাদ এবং ভালবাসায় ভরিয়ে রাখতেন। আমি ওকে ভীষণভাবে মিস করব।" সবশেষে 'কিং খান' লিখেছেন, “শান্তিতে থাকুন আশা তাই... অনেক ভালবাসা।”

শাহরুখের কেরিয়ারের বহু সুপারহিট গানে প্লে-ব্যাক করেছিলেন আশা ভোঁসলে। বিশেষ করে ‘বাজিগর’ থেকে শুরু করে ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’—'কিং' খানের ছবির রোমান্টিক ডুয়েট বা ডান্স নাম্বারে আশার কণ্ঠ ছিল এক বাড়তি আকর্ষণ। বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড ফাংশন বা রিয়ালিটি শো-তে শাহরুখকে সবসময় মাতৃস্নেহে আগলে রাখতে দেখা যেত আশা তাই-কে। সেই চেনা অভিভাবকের বিদায়ে আজ শাহরুখের কলমেও বিষাদের সুর।


৯২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রবিবার সকালে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আশা ভোঁসলে। আগামীকাল অর্থাৎ সোমবার বিকেল ৪টেয় মুম্বইয়ের শিবাজী পার্কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। সেখানে শাহরুখ খানসহ বলিউডের প্রথম সারির নক্ষত্রদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

১৯৪৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে দিদি লতা মঙ্গেশকরের হাত ধরে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন আশা। পাঁচের দশকে যখন তাঁর লতা দিদি একের পর এক সুপারহিট গানে রাজত্ব করছেন, তখন আশাকে লড়তে হয়েছে ‘লতার বোন’ পরিচয়ের সঙ্গে। সেই সময়ে মূলত ডান্স নাম্বার বা ক্যাবারে গানের জন্য তাঁকে সীমিত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দমে যাননি তিনি। হেলেনের লিপে ‘পিয়া তু আব তো আ যা’ কিংবা ‘দম মারো দম’ এই গানগুলোর মাধ্যমেই তিনি নিজের এক অনন্য স্বাক্ষর তৈরি করেন।আশির দশক পর্যন্ত অনেকেই মনে করতেন আশা কেবল চটুল গানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’-এর গজল গেয়ে তিনি সেই ভুল ভেঙে দেন। লতা মঙ্গেশকরের সমতুল্য গাম্ভীর্য আর মাধুর্য নিয়ে তিনি জয় করেন জাতীয় পুরস্কার। এরপর ‘ইজাজত’ ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ বুঝিয়ে দিয়েছিল, আবেগের গভীরতায় তিনি অনন্য। ‘লতার বোন’ পরিচয় ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী আশা ভোঁসলে।

হিন্দি, বাংলা, মারাঠি, গুজরাতি সহ একাধিক ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন আশা। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে শুরু করে পপ, গজল বা লোকসঙ্গীত—প্রতিটি ঘরানায় তাঁর দখল ছিল প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে সঙ্গীত পরিচালক আর.ডি. বর্মনের সঙ্গে তাঁর কালজয়ী জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বাংলা আধুনিক গান এবং সিনেমার গানেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।