প্রয়াত আশা ভোঁসলে। ৯২ বছর বয়সে মুম্বইয়ে ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুরসম্রাজ্ঞী৷ পণ্ডিত দেবজ্যোতি মিশ্র কাজ করেছেন আশা ভোঁসলের সঙ্গে।  সেই কাজের অভিজ্ঞতা কেমন, জানতে চেয়েছিল আজকাল ডট ইন।

দেবজ্যোতি বলেন, "ব্যক্তিগত ভাবে আমার ওঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে৷ সলিল চৌধুরীর সঙ্গে তৃষাগ্নি ছবিতে কাজ করার সময় আমার সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়েছিল৷ আমি যখন ওঁর জন্য গান তৈরি করছি ততদিনে ওঁর হাজার গান গাওয়া হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু আমার কখনও মনে হয়নি যে তিনি ১০০১ নম্বর গান গাইছেন৷ আমার মনে হয়েছিল, তিনি যেন প্রথম কোনও গান গাইছেন, প্রথমবার কোনও সুরকারের জন্য৷ এই যে অনুভূতি একজন সুরকার বা সঙ্গীত পরিচালককে দেওয়া যে তুমি আমার মাস্টার এটা অসাধারণ৷"

দেবজ্যোতি বলেন, "সম্পাদক অর্ঘ্যকমল মিত্রের টেলিভিশনের একটা কাজের জন্য আমি আশা ভোঁসলের সঙ্গে দেখা করি৷ উনি গাইতে এলেন৷ সেদিন ওঁর পায়ে ক্র‍্যাম্প থেকে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল৷ হরিহরণের স্টুডিওতে রেকর্ড করছিলাম৷ অনেক সময়ই সুরটা একটু আগে পরে হচ্ছে৷ উনি বুঝতে পেরে বললেন আমার একটু কষ্ট হচ্ছে৷  একটা কিবোর্ডে দড়ি বাঁধা ছিল৷ সেই দড়িটা নিয়ে এসে শাড়ি সামান্য সরিয়ে দড়িটা শক্ত করে পায়ের মধ্যে বেঁধে ফেললেন৷ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন৷ তারপর ১২ টা ট্র‍্যাকে পরপর গান গাইলেন, বিন্দুমাত্র ভুল ত্রুটি ছাড়া৷ এই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এটা শেখার৷ শিল্পীদের সহনশীল হওয়া প্রয়োজন।  নতুন শিল্পীদের বলব সামান্য অপমান অসম্মানে মুষড়ে না পড়ে সহনশীল হও৷ কারণ আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের সুযোগ হয়েছে, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক শিল্পীকে এত কাছ থেকে দেখার৷ "


"আশা ভোঁসলে দুটো জীবন বেঁচেছেন৷ একটা জীবন পারফর্মারের, শিল্পীর জীবন৷ আরেকটা জীবন সাধারণ, যে জীবনে আনন্দ আছে, বেদনা আছে, বিষাদ আছে৷ এই বিষাদ, বিতর্ক, অপমান সব পেরিয়ে আজকের দিনটা উদযাপনের দিন৷ এই নয় যে আশা ভোঁসলে চলে গেলেন৷ আশা ভোঁসলে নশ্বর শরীর ত্যাগ করে অবিনশ্বর হলেন৷" 

"তিনি কী করে গানের ছন্দের মাধ্যমে হেলেনকে গড়ে তুললেন৷ তিনি কত সঙ্গীত পরিচালক, কত গীতিকার, আনন্দ বক্সী, মজনু সুলতান পুরী আরও কত শিল্পীকে ধারণ করলেন নিজের শিল্পীসত্ত্বার মধ্যে৷ একজন মানুষই চোখে চোখে কথা বলো গাইছেন, আবার চোখে নামে বৃষ্টি, দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়, চুরা লিয়া, দম মারো দম কত কত গান৷ এমন কতজন পারেন যে নিজে শিল্পী থাকাকালীন তাঁর গান গেয়ে অন্য অনেকে শিল্পী হয়ে উঠছেন৷ আশা ভোঁসলে  করেছেন। তিনি পেরেছেন এতদূর আসতে৷ আজ সারা দেশ জুড়ে তাঁর গান নিয়ে কথা হচ্ছে৷ এই যে তুমি আমি ওঁকে নিয়ে কথা বলছি, আমরাও কোনও না কোনও ভাবে সুরের মাধ্যমে ওঁর পরিবারের অংশ। " সংযোজন দেবজ্যোতির৷

কথা প্রসঙ্গে দেবজ্যোতি মিশ্র বলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিগত ২০-২৫ বছরে লেডি গাগা, ম্যাডোনা বা রিহানাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছে৷  কিন্তু আশা ভোঁসলে বিশ্বের সেরা শিল্পীদের অন্যতম।  তিনি বলেন, " সি ইজ ওয়ান অব দ্য ফাইনেস্ট আর্টিস্ট এভার বর্ন", তাঁর উত্তরাধিকার লক্ষ হাজার বছর ধরে প্রবহমান৷

গানে গানে প্রতি মুহূর্তে  বেঁচে থাকবেন আশা, মরনোত্তর জীবন পেলেন আশা এমনটাই অভিমত দেবজ্যোতি মিশ্রের৷ 

লতা-আশার চিরন্তন বিতর্ক প্রসঙ্গে দেবজ্যোতি মিশ্র বলেন, "বয়সে ছোট বলে এবং লতা মঙ্গেশকর একজন বিস্ময়কর শিল্পী বলে সবসময় দ্বিতীয় আর প্রথমের মাঝে দাঁড়িয়েছেন। এই স্বতন্ত্রতার লড়াইও ছিল জীবনভর৷ "

'তৃষ্ণাগ্নি' ছবিতেও যখন আশা গান গাইছেন তখন আর্থিক কিছু অসুবিধা হয়েছিল বলে জানান দেবজ্যোতি মিশ্র৷ সেই সময় আর্থিক অসুবিধার কথা বলা হলে আশা বলেন, "আমি গানটার জন্য গেয়েছি৷ সলিলদার জিন্য গেয়েছি৷ সলিলদার গান গেয়ে কি টাকা নেওয়া যায়!" যে মানুষ একসময় চূড়ান্ত অর্থকষ্টে ভুগেছেন সেই মানুষ এমনও হতে পারেন৷ "আমি চলে যাবার আগে আরেকটি গান গাইব, এই ছিল আশা ভোঁসলে।