শুটিং ফ্লোরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে টলিপাড়ায় উঠছে প্রশ্ন। অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জির অকাল প্রয়াণে প্রযোজনা সংস্থা ম্যাজিক মোমেন্টসের পক্ষ থেকে সেভাবে কোনও যুক্তি না আসায় আর্টিস্ট ফোরাম ও রাহুলের স্ত্রী অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের পক্ষ থেকে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে কলকাতায় ও রাহুলের মৃত্যুর ঘটনাস্থল তালসারিতে। এমনকী ৭ এপ্রিল, মঙ্গলবার থেকে আর্টিস্ট ফোরাম টলিউডে শুটিং বন্ধের ডাক দিয়েছে। এতদিন সমস্ত কিছু নিয়েই মুখে কুলুপ এঁটেছিলেন লীনা গাঙ্গুলির ছেলে অর্গানিক স্টুডিওর প্রযোজক অর্ক গাঙ্গুলি। এবার সমাজমাধ্যমে শুটিংয়ের নিরাপত্তা গাইডলাইন নিয়ে মুখ খুললেন তিনি। সঙ্গে রাহুলকে নিয়ে বেশকিছু অজানা কথাও জানালেন। 

সোমবার অর্ক গাঙ্গুলি সমাজমাধ্যমে লেখেন, 'রাহুলের সঙ্গে প্রথম দেখা প্রায় ১২ বছর আগে - সম্ভবত ২০১৪ বা ২০১৫ সালের দিকে। একদিন রাহুল ফোন করে। আমি তার কিছুদিন আগে ‘খোঁজ’ বলে একটা ছবি বানিয়েছিলাম - বোধহয় সেটা দেখেই জানাতে ফোন করেছিল, বা সেরকমই কিছু একটা হবে। কথায় কথায় বলল, ওর একটা প্রোজেক্ট বেশ কিছুদিন আগে বন্ধ হয়ে গেছে, আর এখন হাতে কোনো স্থায়ী কাজ নেই। আমিও ওকে বলি - আমি একটা নতুন কোম্পানি খুলেছি, এবার ইনডিপেন্ডেন্টলি প্রোডিউস করার কথা ভাবছি। একটা ওয়েব অ্যান্থোলজি বানিয়েছি, আর বোধহয় একটা সিরিয়ালও শুরু হতে পারে। রাহুল সোজাসুজি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “এই তো, তাহলে আমাকেই নে! কেন, মানাবে না?” এতটা ডিরেক্ট কথা শুনে প্রায় হাসিই পেয়ে গিয়েছিল। আমি বলি, “ভাই, আমার কাছে কি তোকে অ্যাফোর্ড করার মতো বাজেট আছে?” রাহুল বলে, “আমার এখন কাজের দরকার, আর তোর প্রথম সিরিয়াল - কাজটা আমি-ই করব কিন্তু।” তারপর একটা নাম্বার বলে, “এই টাকা দিতে পারবি তো? তাহলেই হবে।” আমি জানতাম, ও সাধারণত এর থেকে অনেক বেশি পারিশ্রমিক নেয়। তার ওপর ওর মতো কাউকে নিতে পারলে প্রোজেক্টের ওজনও অনেকটা বেড়ে যাবে। তাই ও যে অ্যামাউন্ট-টা বলল, তার কাছাকাছি একটা অ্যামাউন্ট-এই আমি রাজি হয়ে যাই। মনে মনে জানতাম, চ্যানেল নিশ্চয়ই খুশিই হবে - রাহুলকে লক করতে পেরেছি শুনে। তবু বললাম, একদিন সময় দে - চ্যানেলের সঙ্গে একবার কথা বলে নিই। আমাদের দিক থেকে তো লকড।' (পোস্টের সমস্ত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

অর্ক আরও লেখেন,' এরপর সেদিন সন্ধে পর্যন্ত চ্যানেলে মিটিং চলছিল। হঠাৎ দেখি রাহুল ফোন করছে। ভাবলাম পরে কল ব্যাক করব, কিন্তু রাত হয়ে গেল, আর তারপর ভুলেই গেলাম। পরের দিন দুপুরে মনে পড়তেই ফোন করি। চ্যানেল থেকেও যে সবাই হাসিমুখে রাজি হয়ে গেছে - সেটাও ওকে বলার ছিল। কিন্তু ফোন করতেই বুঝতে পারি, এক অদ্ভুত কাণ্ড হয়ে গেছে। আমি ফোন রাখতেই ওকে ফোন করেছে SVF থেকে, আর যে টাকায় আমার সঙ্গে কথা হয়েছিল তার থেকে অনেকটা বেশি টাকা অফার করেছে ওকে অন্য একটা প্রোজেক্টের জন্য। তাই কী করবে বুঝতে না পেরে আমায় ফোন করছিল। টাকার অঙ্কটা শুনে আমি আর কিছু বলতে পারি না। চ্যানেলের দিদিদের মুখগুলো একবার করে মনে আসে ঠিকই, কিন্তু তারপরই মনে হয় - আমার জন্য প্রতি মাসে এতগুলো করে টাকা লস করবে? তার সঙ্গে আরও একটা পার্সোনাল সুবিধার কথা বলে - সেটা শুনেও বুঝতে পারি যে এটাও আমাদের এখানে কাজ করলে ও  পাবে না। রাহুল হয়তো একটু হেসিটেট করছিল, কিন্তু আমি-ই বলে দিই - এতগুলো টাকা পাচ্ছিস, আর বেশি ভাবিস না, ওটাই করে নে।' (পোস্টের বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

তিনি লেখেন, 'দেশের মাটি-তে কাজ অফার হওয়ার সময়েও ওর সঙ্গে আলাদা করে ফোনে কথা হয়েছিল। এর আগে ও শুধু হিরোর চরিত্র করত, এই প্রথম সাপোর্টিং চরিত্র। হিরোদের যেমন মিনিমাম গ্যারান্টি মাসিক কনট্র্যাক্ট হয়, তাতে পারিশ্রমিক অনেকটাই গ্যারান্টিড থাকে। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে কাজ করাটা ওর জন্য খানিকটা কালচারাল শক। প্রোডাকশন থেকে বোধহয় জানিয়েছিল, ওই চরিত্রের জন্য মিনিমাম গ্যারান্টি করা যাবে না। আমি ঠিক কী বলেছিলাম, মনে নেই, কিন্তু কাজটা ও ফাইনালি করেছিল। আপনাদের মধ্যে অনেকের হয়তো মনে আছে - এই ধারাবাহিকটিতে একটা সময়ের পরে রাহুল আর রুকমার “রাজা-মাম্পি” জুটি ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। লোকে রাজা আর মাম্পিকে দিয়েই দেশের মাটিকে চিনতে শুরু করে। আপনারা হয়তো কেউ কেউ জানেন, “দেশের মাটি”-র স্ক্রিপ্ট লিখতেন আমার মা। মা আবার যার অভিনয় পছন্দ হয়, তাকে মন থেকে সাজিয়ে চরিত্র দেয়। আমি জানতাম, রাহুলকে মায়ের পছন্দ হবে। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, আমার কোনো বন্ধু যদি একটু ভালো বাংলা লেখে বা একটু সুনীল-শক্তি পড়ে, সে মায়ের বন্ধু হয়ে যায়।' (পোস্টের সমস্ত বানান অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

সবশেষে অর্ক গাঙ্গুলি লেখেন, 'ফেডারেশন আর EIMPA মিলে সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি নিয়ে গাইডলাইনস তৈরি করতে চায়, সাধুবাদ জানাই - নিশ্চয়ই সাধ্য মতো সহযোগিতা করব। বছর খানেক আগে যে লাইটম্যান অন জব ইলেকট্রিফায়েড হয়ে মারা গেছিল, বা যে ছাদ থেকে পড়ে গেছিল লাইট বাঁধতে গিয়ে, তারা-ও আমাদের ভাই। তাদের নিয়ে হয়তো নিউজ হয়নি, কিন্তু তাদেরও পরিবার আছে। প্রতিবাদ পার্সোনাল এজেন্ডা হয়ে গিয়ে দুজন মানুষের জীবনের দামের মধ্যে যাতে ইমপার্শিয়ালিটি ক্রিয়েট না করে, সেটা এনশিওর করা-ও আমাদের সবারই কর্তব্য।
সব শেষ এ সহজের জন্য বলি - সহজ, তুমি আমাকে কখনও দেখোনি কিন্তু তুমি আমার খুব আদরের। আমি জানি তুমি অলরেডি এক ঝটকায় অনেকটা বড় হয়ে গেছো, আরও বড় যখন হবে তখন নিশ্চয়ই পুরো বিষয়টা বুঝবে। কারুর কথা শুনে নয়, নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়েই বুঝবে। তখন হয়তো বুঝবে এই আঙ্কলটা তোমার বাবাকে আরো অনেকের মতনই ভালবাসত।'

অর্কর এই লেখা দেখে সমাজমাধ্যমে তাঁকে সাধুবাদ জানিয়েছেন টলিপাড়ার অনেকেই। কেউ কেউ আবার এত দেরি করে মুখ খোলার জন্য আক্ষেপ করেছেন।