উৎপলবাবু, উৎপল কাকু বা স্যার নয়। ডাকতাম উৎপলদা বলে। বাবার সহকর্মী-বন্ধু ছিলেন, তবু উনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন উৎপলদা বলেই ডাকতে। বেঁচে থাকলে আজ তাঁর বয়স হত ৯৭। ওঁর জন্মদিন এলেই হুড়মুড় করে এত স্মৃতি ভাগ করে আসে... তাই আজকের দিনে এই লেখা ওঁর মতো শক্তিশালী ও বহুমুখী অভিনেতার অভিনয়, রাজনৈতিক দর্শনকে বিশ্লেষণ করার জন্য নয়। বলতে পারেন, খানিক ব্যক্তিগত। তাই হয়তো খানিক এলোমেলোও লাগতে পারে। তবে যতটুকু বলব, সত্যিই বলব।

অনেকেই জানেন না, উৎপল দত্তের হাত ধরেই কিন্তু আমার অভিনয় জগতে পা রাখা। একদম ঠিক শুনছেন। উৎপল দত্ত না থাকলে অভিনেতা কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় হত না। বড়পর্দায় একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন উৎপলদা -নাম 'ঝড়'। হেনরি ডিরোজিওর কর্মকাণ্ড নিয়ে সে ছবিতে আমাকে কাস্ট করেছিলেন উনি। ডিরোজিও-র প্রধান ছাত্রর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম আমি। সে ছবিতে আমার বাবা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়ও কিন্তু অভিনয় করেছিলেন ‘ডেভিড হেয়ার’-এর ভূমিকায়। শুধু তাই নয়, বাবার সঙ্গে মুখোমুখি একটি দৃশ্যে অভিনয় করার সুযোগও করে দিয়েছিলেন উৎপলদা। ক'জনের এমন সৌভাগ্য হয়?  

 

 

আর সেই ছবিতে সুযোগ পাওয়াও অদ্ভুতভাবে। অভিনয়কে পেশা করব- এমন কোনও ইচ্ছে মনের কোনও কোণেই ঠাঁই পায়নি সেই সময়। গান নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। স্পষ্ট না আছে, সাতের দশকের শেষ দিকে এমনই একটা মার্চ মাস। দিনটাও মনে আছে শনিবার। বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎ বাবা গাড়িটা বের করার নির্দেশ দিয়ে বললেন এনটি ওয়ান ষ্টুডিওতে যেতে। কারণ? উৎপলবাবুর সঙ্গে দেখা করবেন। তা গেলাম চালিয়ে। উৎপল দত্ত একটা ছবির শুটিং করছিলেন। গিয়ে দেখি উত্তমকুমার, অনিল চট্টোপাধ্যায়রাও ওখানে বসে আড্ডা মারছেন। আমি তো এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। বাবা কথাবার্তা সেরে আমাকে ইশারা করলেন, আমি বেরোচ্ছি, এমন সময় কে যেন আমার জামা ধরে টানল! ঘুরে দেখি, শোভা সেন -উৎপলদার স্ত্রী। আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন ওঁর স্বামীর কাছে –‘দ্যাখো তো, এরকম একটা ছেলেকে খুঁজছিলে না?’ প্রশ্ন শুনে আমার দিকে তাকালেন উৎপলদা। খানিক মাপলেন। তারপর প্রশ্ন এল –‘আগামীকাল বিকেল ৫টা নাগাদ কী করা হচ্ছে?’ ওঁকে তো আর বলতে পারি কিশোরকুমারের অনুষ্ঠান দেখতে যাব। খানিক বাধ্য হয়েই জানালাম, কিছু করছি না। ওঁর  বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ এল। ঘাড় নেড়েছিলাম।ঠিক সময়ে পৌঁছতেই হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। ডেকে নিলেন শোভা সেন-কে। অভিনয় করতে বলা হল মা-ছেলের একটা দৃশ্য। কী করলাম কে জানে, পাশ করে গেলাম। তারপরেই ‘ঝড়’। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রযোজনার দায়িত্বে ছিল। রাজভবনে পর্যন্ত শুটিং করেছিলাম আমরা হৈহৈ করে। যাই হোক, বক্স অফিসে সফল হয়নি সে ছবি, তবে আমার বিষয়ে উৎপলদা সবার কাছে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ফলে পরপর ছবি পেতে সমস্যা হয়নি আর আমার।


উৎপলদাকে নিয়ে সব কথা বলার জায়গা এটা নয় অথবা এখন নয়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রচুর স্মৃতি আছে ওঁকে নিয়ে। যা বলা যায়, যতটুকু মনে পড়ছে, বলছি। ওঁর মতো এত বিদ্বান, রসিক এবং উইটি  মানুষ আমি আর দেখিনি বললেই চলে। ডিসিপ্লিন ওঁর কাছে শেষ কথা ছিল। স্বভাব গম্ভীর ছিলেন -এ কথা ঠিক তবে এটাও বলব তা শুধু নাটকের মহড়া এবং শুটিং সেটে। বাকি সময়টুকুতে যেন অন্য মানুষে পরিণত হতেন উৎপলদা . তবে হ্যাঁ, নাটকের মহড়ায় কেউ এক ভুল বারবার করলে অথবা সময়মতো হাজিরা না দিলে ক্ষেপে যেতেন। হাতের কাছে বই থাকলে ছুঁড়ে মেরে দিতেন, রেগে গিয়ে এক লাঠিতে নাটকের প্রপস-ও ভাঙতে দেখেছি। এরকম আগুনে রাগ ছিল ওঁর। আবার সেসব মিটলেই ঠান্ডা। আসলে, থিয়েটার ছিল ওঁর যাপন। ধ্যান-জ্ঞান। তাই তা নিয়ে যে স্পর্শকাতর হবেন, সে কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই নিশ্চয়ই। 

 

 

অসম্ভব বই পড়তে ভালবাসতেন। কত ধরনের বই যে পড়তেন। গানের সমঝদার ছিলেন। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল তো গুলে খেয়েছিলেন। একটা মজার কথা বলি। ঘড়ি ধরে ঠিক কল টাইমে সেটে আসতেন উৎপলদা। এসেই পরিচালককে মনে করিয়ে দিতেন কতক্ষণ পর্যন্ত শুট করবেন।  ধরুন বিকেল ৪টে পর্যন্ত। তাই ৩টে বাজলেই তারপর থেকে মিনিট পনেরো অন্তর উঁচু গলায় হেঁকে সময়টা বলতেন, যাতে পরিচালকের কানে যায়। যেই না ৪টে বাজত, ব্যস! আর কোনও কথা নেই। এক টানে নকল গোঁফ খুলে সবাইকে ‘বাই’ বলে সেট থেকে গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে যেতেন! এরকম ব্যক্তিত্ব ছিল। 


মুরগির মাংসে অরুচি ছিল। গনগনে আঁচে পাঁঠার কষা মাংস খেতে বড় ভালবাসতেন। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন –‘আচ্ছা, মুরগির মাংস খান না কেন?’ হাসতে হাসতে জবাব এসেছিল – ‘ধুর, যার নিজের গায়েই জোর নেই তার মাংস খেয়ে আবার আমার জোর বাড়বে কী করে?’ বুঝুন! 

একটা কথা এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি। নাম বলব না তবে এমন অনেক অভিনেতাকে আজকাল দেখি সংবাদমাধ্যমে কিংবা প্রকাশ্যে দাবি করে উৎপলদার সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ওঁদের। বিশ্বাস করুন, কোনওদিন উৎপল দত্তের ধারেপাশে দেখিনি টলিপাড়ার এইসব অভিনেতাদের। জোর গলায় বলতে পারছি, কারণ ওঁর বাড়িতে আমার অবারিত দ্বার ছিল। আমি-ই সম্ভবত বাংলার একমাত্র অভিনেতা যে উৎপল দত্তের বোম্বের বাড়িতে গিয়ে দিনের পর দিন থেকেছি, ওঁর এক টেবিলে সঙ্গে খেয়েছি। এত স্মৃতি যে একটা বই লেখা যেতে পারে।তাই এইসব অভিনেতাদের দাবি শুনলে হাসি পায়, করুণা হয়।  

উৎপল দত্তকে আজকের প্রজন্ম কতটা চিনল, মনে রাখল তাতে ওঁর কাজ ছোট হয়ে যায় না। ওঁর নামের গরিমা তাতে এতটুকুও কমবে না। এতটুকুও না। না করলে, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের ক্ষতি, এটুকু বলতে পারি। আর আমার সাধ্য নেই ওঁর কাজ নিয়ে কাটাছেঁড়া করার। তবে আমার কাছে মঞ্চে উৎপল দত্তের সেরা অভিনয় ‘দাঁড়াও পথিকবর’ আর বড়পর্দায় হীরক রাজার দেশে। শেষ করি, এই কথা বলে যে আমার বাবা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় উৎপল দত্তকে নিজের থিয়েটারের গুরু মানতেন। উৎপলদার নির্দেশনায় ‘ফেরারি ফৌজ’ নাটকে অভিনয়ের জন্য বাবা ভূয়সী প্ৰশংসা পেয়েছিলেন, প্রচুর পুরস্কার-সম্মান পেয়েছিলেন। আবার দেখুন, আমারও অভিনয়ের গুরু উৎপল দত্ত। জীবন যে কতভাবে আশ্চর্য করে! 

উৎপলদা আমার প্রণাম নেবেন। ভাগ্যিস আপনি ছিলেন!

 

 

&t=2069s