আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে তীব্র কটাক্ষ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার সময় তিনি বলেন, ভবানীপুরে নিজের "ঘরের মাঠে"ই পরাজিত হয়েছেন মমতা ব্যানার্জি।
বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অমিত শাহ এই মন্তব্য করেন, "শুভেন্দু দা আপনার নিজের ঘরে এসে আপনাকে পরাজিত করেছেন।" নিজের দুর্গেই যে ধরাশায়ী মমতা তা ফের তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বিজেপির 'চাণক্য'।
শুক্রবারের বৈঠকেই ৫৫ বছর বয়সী শুভেন্দু অধিকারীকে দলের পরিষদীয় দলনেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়। বাংলায় প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবেও তুলে ধরা হয় শুভেন্দু অধিকারীকে।
বিজেপির পক্ষে আসা এই বিপুল জনরায়কে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এক 'মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত' হিসেবে বর্ণনা করে শাহ। তিনি বলেন, "দিদি নিজের ঘরের মাঠেই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছেন।"
বিজেপির এই বিজয়কে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে শাহ বলেন, "দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে বাংলা গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির শিকার হয়েছে। আজ বাংলা এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, "প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এখন সেই প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করার দায়িত্ব দলের কাঁধেই ন্যস্ত।"
এই জয়ের বিশাল ব্যাপ্তি তুলে ধরে অমিত শাহ উল্লেখ করেন যে, ৩০টি জেলার মধ্যে ২০টিতেই বিজেপি এক নম্বর দল হিসেবে উঠে এসেছে। এছাড়া পূর্ব মেদিনীপুর, আসানসোল, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ার মতো অঞ্চলগুলোতেও দল বিপুল বিজয় অর্জন করেছে। তিনি বলেন, "এমন একটিও জেলা নেই যেখানে আমাদের কোনও বিধায়ক নেই।"
বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি এবং শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের বিষয়টিরও তিনি প্রশংসা করেন। শাহ বলেন, "ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দু'টি পর্বের ভোটগ্রহণই কোনও প্রাণহানি ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।" তিনি নির্বাচন কমিশন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের অভিনন্দন জানান- যাদের প্রচেষ্টায় তাঁর ভাষায় একটি "আদর্শ নির্বাচন" অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিরোধী শিবিরের দিকে তোপ দেগে অমিত শাহ মেরুকরণের অভিযোগ সম্পূর্ণ খারিজ করে দেন। তিনি বলেন, "এটি মেরুকরণের বিষয় নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।" তিনি আরও জানান যে, বিজেপি সারা দেশজুড়ে "প্রতিটি বুথে বুথে" গিয়ে যেকোনও ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কংগ্রেস নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন যে, নির্বাচনে বারবার পরাজয়ের ঘটনাটি এখন "গভীর আত্মবিশ্লেষণের" দাবি রাখে। তিনি বলেন, "রাজনীতির আঙিনায় যারা আত্মবিশ্লেষণ করতে অস্বীকার করেন, তারা কখনওই প্রকৃত বিজয় অর্জন করতে পারেন না।"
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ায় অভিনন্দনও জানান। এই নির্বাচনী রায়কে তিনি একটি "ঐতিহাসিক জনরায়" হিসেবে অভিহিত করেন এবং তাঁর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেন। শাহ বলেন, "আমি তাঁকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই। আমি আশা করি, এই ঐতিহাসিক জনরায় বাংলার মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যম হয়ে উঠবে।"
অধিকারী-র সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, "আমি শুভেন্দু অধিকারীকে দীর্ঘকাল ধরে চিনি। তিনি একজন লড়াকু মানুষ। আমি তাঁর রাজনৈতিক উত্থান এবং তৃণমূল স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ- উভয়ই প্রত্যক্ষ করেছি।"
অমিত শাহ উল্লেখ করেন যে, নানাবিধ বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও কাঁথির অধিকারী পরিবারের মেজ ছেলেটি তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি বলেন, "প্রশাসন তাঁর পথে বহু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল, তবুও শুভেন্দুজি অদম্য সংকল্প নিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তিনি যে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, আজ তারই সুফল পাওয়া গিয়েছে।"
বিজেপি-র ওপর আস্থা রাখার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্যের জনগণকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন যে, পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘকাল ধরে এমন এক পরিস্থিতির সাক্ষী ছিল, যেখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তিনি বলেন, "বামফ্রন্ট আমল থেকে রাজ্যে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, মমতা ব্যানার্জির শাসনকালে তা আরও গভীর আকার ধারণ করে। সেখানে ভোটদান করাটা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।"
দলের কর্মীদের 'সোনার বাংলা' (সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলা)-র স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শাহ বলেন যে, "রাজ্যটি এখন এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে, যেখানে চিত্ত ভয়শূন্য এবং শির উন্নত"- এক্ষেত্রে তিনি নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙক্তিমালাকেই স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "এই বিজয় প্রধানমন্ত্রী মোদির সেই বক্তব্যেরই প্রতিফলন, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে—পূর্ব ও পশ্চিম ভারতকে অবশ্যই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে প্রগতির পথে এগিয়ে যেতে হবে।" একইসঙ্গে তিনি সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে এবং নির্বাচন-কেন্দ্রিক হিংসা নির্মূল করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করে।
বাংলার বিধানসভা ভোটে বিজেপি ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে। তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজেপি এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে। মমতার নেতৃত্বাধীন দলটি মাত্র ৮০টি আসনে জয়ী হয়েছে। নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জিকে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পরাজিত করলেন শুভেন্দু অধিকারী। এ বছর ভবানীপুর আসনে এবং এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে।















