কৃশানু মজুমদার: ফুটবলারদের চোখে তিনি কঠোর-কঠিন। তিনিই আবার খেলার শৃঙ্খলার শেষ আশ্রয়। 

মাঠের ভিড়ে তিনি একা। তাঁর বাঁশি নিয়ন্ত্রণ করে যায় টানটান উত্তেজনার নব্বই মিনিট। পকেটে তাঁর দুই অস্ত্র—লাল ও হলুদ কার্ড। দিনের শেষে কংক্রিটের গ্যালারি থেকে তাঁর দিকেই উড়ে আসে দুয়োধ্বনি। ধেয়ে আসে ইট-পাথর। 

সেই রেফারিই এবার অন্য এক মাঠে। গণতন্ত্রের উৎসবের পুরোহিত। বাম সমর্থিত আইএসএফের টিকিটে মিনাখাঁ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে এবার দাঁড়িয়েছেন রেফারি প্রতীক মণ্ডল। 

আইএসএলের গ্রহে পরিচিত বঙ্গতনয় প্রতীক। এখনও পর্যন্ত চলতি মরশুমের আইএসএলে তিনটি ম্যাচ তিনি পরিচালনা করেছেন। সেই প্রতীক আজকাল ডট ইন-কে বলছেন, ''ফুটবলমাঠে নব্বই মিনিটের একটা ম্যাচ পরিচালনা করা খুবই কঠিন কাজ। শক্ত হাতে ম্যাচ পরিচালনা করতে হয়। উনিশ-বিশ হয়ে গেলেই ম্যাচ হাতের বাইরে চলে যাবে। কিন্তু ভোটের ময়দানে অন্য লড়াই। আমার পকেটে নেই হলুদ বা লাল কার্ড। বলতে পারেন, এই লড়াইয়ে মানুষই রেফারি। তাঁরাই স্থির করবেন কাকে হলুদ কার্ড দেখাবেন, কাকে লাল কার্ড।'' 

মিনাখাঁ বিধানসভায় প্রতীকের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ঊষারানি মণ্ডল এবং বিজেপি-র প্রার্থী রুদ্রেন্দ্র পাত্র। লড়াই কঠিন। কিন্তু ফুটবলমাঠে এমন টেনশনের ম্যাচ কতই তো তিনি পরিচালনা করেছেন। 

রেফারিদের দৃষ্টি হয় স্বচ্ছ, আরেকদিক থেকে তাঁরা দূরদৃষ্টি সম্পন্নও বটে। ফুটবলারদের উদ্দেশ্য আগেভাগেই ধরে ফেলেন। ফুটবলমাঠ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মাঠে কেন তিনি নামলেন? প্রতীক বলছেন, ''আগে সোশ্যাল ওয়ার্ক করতাম। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে কাজ করার সুযোগ হয়নি। মানুষের পাশে চিরকাল থাকতে চেয়েছি। এবার আইএসএফ-এর নেতৃত্ব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওদের চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি শুনে আমার মনে হয়েছে মানুষের পাশে, মানুষের জন্য লড়াই করা যেতেই পারে। ওদের কথা শুনে ভাল লেগেছে। আমিও সম্মতি দিয়েছি।'' 

প্রতীকের বাড়ির কেউই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। তাঁর বাবার প্রয়াণের পরে মাছের ব্যবসা এখন আর নেই। মা জামাকাপড়ের ব্যবসা দেখা শোনা করেন। প্রতীকের ভালবাসা মাঠ। ফুটবলমাঠই তাঁর যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী। ফুটবলমাঠ থেকে দূরে সরে থাকা তাঁর কাছে মৃত্যুযন্ত্রণার সামিল। 

ফুটবলাররা রাজনীতিতে এসেছেন। ভোটেও দাঁড়িয়েছেন। ক্রিকেটারদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু রেফারি রাজনৈতিক দলের টিকিটে ভোটে লড়ছেন স্মরণকালের মধ্যে তা শোনা যায়নি। 

প্রতীক বলছেন, ''শুরুটা না হয় আমাকে দিয়েই হল। আমাকে দেখে এগিয়ে আসুক আরও অনেকে। ফুটবলারদের মতোই মতোই রেফারিরা পরিশ্রম করেন। মানুষও আজকাল রেফারিদের চেনেন।'' 

কিন্তু মাঠের ফলাফল যাই হোক না কেন, উন্মত্ত গ্যালারি থেকে রেফারির দিকে যে ধেয়ে আসে দর্শকদের ক্ষোভ। রেফারিরাও যে রক্তমাংসের মানুষ তা বুঝতে চান না সমর্থকরা। তিনি যে নতুন মাঠে নেমেছেন, সেখানেও তো এমন ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রতীক মাঝপথেই থামিয়ে দেন প্রশ্ন। স্বতঃস্ফুর্তভাবে বলে ওঠেন, ''মিনাখাঁ সব দিক থেকে সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে উঠুক। সৌজন্যের রাজনীতি পছন্দ করি। মিনাখাঁয় প্রতিষ্ঠিত হোক আদর্শের রাজনীতি। বিরোধীরা যদি আমার দলের দ্বারা বাধাপ্রাপ্তও হয়, তাহলে বিরোধীদের নমিনেশন দেওয়ার কাজটা আমাদেরই করতে হবে। সুস্থ গণতান্ত্রিক শান্তির জায়গা হয়ে উঠুক মিনাখাঁ সেটাই আমাদের লক্ষ্য।'' 

এখনও প্রচারে নামেননি। দু-একদিনের মধ্যেই নেমে পড়বেন প্রতীক। ঝড়-জল-রোদের মধ্যে শুরু করে দেবেন প্রচারের কাজ। তিনি বলছেন, ''আশা নিয়ে সবাই বাঁচেন। আমিও আশা নিয়েই নেমেছি। বাকিটা মানুষ বলবেন।'' 

প্রতীক জানেন এই মাঠ সব অর্থেই আলাদা। এখানে অফসাইডের রেখা চোখে পড়ে না, ফাউলের হিসেব লেখা থাকে না কোনও নিয়মপুস্তকে। এখানে মানুষই হয়ে ওঠেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী। 
এক রেফারি জানেন মানুষই এই মাঠের সেরা রেফারি।