আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'পুষ্পা জমানার অবসান?' পুনর্নির্বাচনে বদলে যাওয়া ফলতা, শান্তির আবহে ভোটের উৎসব। 

 

একসময় রাজনৈতিক উত্তাপ, সংঘর্ষ, অভিযোগ আর আতঙ্কের জন্য বারবার শিরোনামে উঠে আসত দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র। যে ফলতাকে দীর্ঘদিন তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি বলে মনে করা হতো, সেই ফলতার মাটিতেই এবার যেন বদলের হাওয়া। 

 

২৯ তারিখের বিতর্কিত নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে আজ বৃহস্পতিবার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ২৮৫টি বুথে শুরু হয়েছে পুনর্নির্বাচন। সকাল থেকেই বুথে বুথে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন, তবে এবারের ছবি কিছুটা আলাদা। অন্তত স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বহু বছর পর শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন তাঁরা। 

 

রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই ফলতার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরে ফলতা রাজনীতিতে প্রভাবশালী মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের জাহাঙ্গীর খান। স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব এতটাই ছিল যে অনেকেই তাঁকে ফলতার “বেতাজ বাদশা” বলেই উল্লেখ করতেন। 

 

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফলতায় তৃণমূলের অন্যতম বড় ভরসা ছিলেন জাহাঙ্গীর খান। তবে পুনর্নির্বাচনের ঠিক দু’দিন আগে তাঁর প্রার্থী পদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে নতুন করে জল্পনা শুরু হয় রাজনৈতিক মহলে। 

 

উল্লেখ্য, গত ২৯ তারিখে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালীন একাধিক বুথে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বহু জায়গায় ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ইভিএম-এ কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং বুথ দখলের মতো অভিযোগও ওঠে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছিল। পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হলে কমিশন অভিযোগ খতিয়ে দেখে ফলতার ২৮৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেয়।

 

পুনর্নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই ফলতার বিভিন্ন প্রান্তে ছিল উৎসবের আবহ। বুথ খোলার আগেই বহু ভোটার লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন। প্রবীণ নাগরিক থেকে যুবক-যুবতী, সকলের মধ্যেই ছিল ভোট দেওয়ার আগ্রহ। বহু ভোটারের দাবি, গত এক দশকের মধ্যে এমন শান্তিপূর্ণ ভোট তাঁরা খুব কমই দেখেছেন। 

 

স্থানীয় বাসিন্দা দেবাশিস মাঝির অভিযোগ, আগের নির্বাচনে তাঁকে ভোট দিতেই দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, “গত ২৯ তারিখে আমরা ভোট দিতে পারিনি। ভোটার কার্ড ও আধার কার্ড কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ভয় দেখানো হয়েছিল, প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ঘরছাড়া ছিলাম। চার তারিখের পর পরিস্থিতি বদলেছে। এলাকায় শান্তি ফিরেছে। আজ আনন্দের সঙ্গে ভোট দিচ্ছি।” যদিও তাঁর এই অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 

 

একই সুর শোনা গেল সাধারণ ভোটার অভিষেক প্রামাণিকের গলাতেও। তিনি বলেন, “আগে ভোট মানেই আতঙ্ক ছিল। বুথে যাওয়া নিয়েও ভয় কাজ করত। এবার পরিবেশ একেবারে অন্যরকম। আমরা উৎসবের মেজাজে ভোট দিচ্ছি। ফলতার উন্নয়ন চাই। বন্ধ কোম্পানিগুলো ফের চালু হোক, যুবকদের কর্মসংস্থান হোক।” 

 

অংশু মাঝি নামে এক মহিলা ভোটারও আগের ভোট নিয়ে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, বুথের বাইরে দাঁড়িয়ে ভোটারদের উপর নজরদারি করা হতো এবং ভয় দেখানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। 

 

এদিকে, পুনর্নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন বুথ ঘুরে দেখতে দেখা যায় বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পান্ডাকে। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা, বুথের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বিজেপির দাবি, এবার মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এবং ফলতায় “শান্তির পরিবেশ” ফিরে এসেছে। 

 

অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি বুথে তৃণমূল কংগ্রেসের এজেন্টদের তেমন সক্রিয় দেখা যায়নি বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাহাঙ্গীর খানের সরে দাঁড়ানো এবং পুনর্নির্বাচনের আবহ ফলতার রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এদিন কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি বুথে মোতায়েন ছিল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে বাড়ানো হয় নজরদারি। নির্বাচন কমিশনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল— কোনওভাবেই যাতে অশান্তি না ছড়ায় এবং সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। 

 

সব মিলিয়ে, ফলতার পুনর্নির্বাচন শুধুমাত্র একটি ভোট নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, অভিযোগ-প্রত্যাঘাত এবং পরিবর্তনের দাবির মধ্যে মানুষের মনোভাবেরও এক বড় পরীক্ষা। বহু মানুষের দাবি— “অশান্ত ফলতা” এখন “শান্ত ফলতা”র পথে হাঁটছে। তবে এই বদলের আসল প্রতিফলন মিলবে ফল ঘোষণার।