ভারতের সনাতনী রাজনীতি চিরকালই বাহুবল, অর্থবল আর বংশানুক্রমিক ক্ষমতার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে, যার কারণে দেশের যুবসমাজ বা 'জেন-জি' প্রজন্ম দীর্ঘদিন ধরেই মূলধারার রাজনীতির প্রতি উদাসীন ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সেই চেনা ছক ওলটপালট হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন রাজনৈতিক মিম, ট্রেন্ডিং রিল আর তীব্র শ্লেষে ভরা পোস্টে উপচে পড়ছে। আর এই গোটা ঝড়ের কেন্দ্রে রয়েছেন ৩০ বছর বয়সী এক যুবক এবং তাঁর সদ্যগঠিত ব্যঙ্গাত্মক বা স্যাটায়ারিক্যাল দল— 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি।
2
8
এই অভাবনীয় আন্দোলনের সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। গত ১৫ই মে একটি মামলার শুনানি চলাকালীন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার যুবকদের একাংশকে 'আরশোলা' এবং সমাজের 'পরজীবী'র সাথে তুলনা করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, কিছু বেকার যুবক চাকরি না পেয়ে সাংবাদিক, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট বা আরটিআই কর্মী হয়ে উঠছে এবং গোটা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। যদিও পরে প্রধান বিচারপতি স্পষ্টীকরণ দিয়ে জানান যে, তাঁর মন্তব্যটি সাধারণ যুবকদের উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং ভুয়ো ডিগ্রিধারী আইনি পেশাজীবী ও নোবেল পেশায় অনুপ্রবেশকারীদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছিল— ততক্ষণে নেটদুনিয়ার ক্ষোভের বারুদে আগুন লেগে গেছে।
3
8
এই অপমান ও বেকারত্বের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে অস্ত্র করেই মাঠে নামেন পুনের সাংবাদিকতার স্নাতক এবং বর্তমানে বস্টন ইউনিভার্সিটির জনসংযোগের ছাত্র অভিজিৎ ডিপকে। আম আদমি পার্টির প্রাক্তন এই সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রধান বিচারপতির মন্তব্যটিকে খারিজ না করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে লুফে নেন। তিনি ঘোষণা করেন, "হ্যাঁ, আমিই সেই আরশোলা।" আর এর পরেই ১৬ই মে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করে 'ককরোচ জনতা পার্টি', যার স্লোগান দেওয়া হয়েছে 'অলস ও বেকার যুবকদের কণ্ঠস্বর'।
4
8
মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এই ভার্চুয়াল দলটির সদস্য সংখ্যা সাড়ে তিন লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে এবং ইনস্টাগ্রামে এর ফলোয়ার সংখ্যা ১০ মিলিয়ন পার করে দেশের বর্তমান শাসকদল বিজেপি-কেও টেক্কা দিয়েছে। মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ এবং প্রশান্ত ভূষণের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও এই আন্দোলনকে পরোক্ষ সমর্থন জানিয়েছেন।
5
8
আপাতদৃষ্টিতে মিম এবং রসিকতা মনে হলেও, এই দলের ৫ দফার নির্বাচনী ইশতেহার কিন্তু ভারতীয় শাসনব্যবস্থার দিকে অত্যন্ত গুরুতর কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। সিজেপি দাবি তুলেছে, অবসর নেওয়ার পর কোনও প্রধান বিচারপতিকে যাতে পুরস্কার হিসেবে রাজ্যসভার আসন না দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
6
8
কোনও রাজ্যে সাধারণ নাগরিকের ভোট বাদ পড়লে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ করা, মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলির লাইসেন্স বাতিল করা এবং দলত্যাগী বিধায়ক বা সাংসদদের পরবর্তী ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা সরকারি পদে বসার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করার দাবিও রাখা হয়েছে এই তালিকায়।
7
8
এমনকি এই দলের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতাও রাখা হয়েছে অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে বেকার হতে হবে— তা সে পরিস্থিতির চাপে, নিজের ইচ্ছায় বা আদর্শগত কারণেই হোক। শারীরিক কর্মক্ষমতা না থাকলেও মগজে চিন্তার ঝড় চলতে হবে, দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকতে হবে এবং সমাজ ও ব্যবস্থার আসল সমস্যাগুলো নিয়ে যুক্তিপূর্ণভাবে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে।
8
8
দলটি এখনো নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত না হলেও, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে দেশের তীব্র কর্মসংস্থান সংকট নিয়ে সিজেপি-র প্রতিবাদী গান ‘হ্যাঁ ম্যায় হুঁ ককরোচ’ এখন তরুণ প্রজন্মের মুখে মুখে ঘুরছে। political বিশ্লেষকদের মতে, রসিকতার ছলে শুরু হওয়া এই 'আরশোলা বাহিনী' আসলে দেশের যুবসমাজের দীর্ঘদিনের অবহেলা, ক্ষোভ এবং অধিকারহীনতার এক জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে, যা আগামী দিনে ভারতের ডিজিটাল রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।