রাজ্যজুড়ে চলছে প্রথম দফার ভোট। গণতন্ত্রের এই উৎসবে শামিল হওয়ার জন্য যখন সাধারণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছেন, তখন মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারে নেমে এসেছে এক গভীর বিষণ্ণতা। যে শহরের ইতিহাস, স্থাপত্য, আর ঐতিহ্যের প্রতিটি ইটে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পূর্বপুরুষদের নাম, সেই শহরের ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হলেন নবাব মীরজাফরের বংশধরেরা!
মুর্শিদাবাদ জেলার ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে নবাব মীরজাফরের বংশধরদের নাম! প্রথমে বিবেচনাধীন থাকলেও পরে ভোটার তালিকা প্রকাশ পেলে দেখা গিয়েছিল তাতে নাম নেই! তাঁর ১৫তম বংশধর মহম্মদ রেজা আলি মির্জা। যিনি মুর্শিদাবাদে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত। এখনও ‘কিল্লা নিজামত’ এলাকার ঘণ্টা ঘরের কাছে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি। তাঁর ছেলে তথা নবাবের ১৬তম বংশধর সৈয়দ মহম্মদ ফাহিম মির্জাও বাবার সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন। মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর তিনি। ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে দেওয়া হয়েছে তাঁরও! ওই অঞ্চলে নবাব পরিবারের হাজার তিনেক সদস্যের বাস। তাঁদের মধ্যে হাজার দুয়েক ভোটার। এ বারের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গিয়েছে প্রায় তিনশো জনের।
দিনকয়েক আগে আজকাল ডট ইন-কে ছোটে নবাব জানিয়েছিলেন, গোটা ঘটনায় তিনি শুধু দুঃখিত-ই নন, বরং ব্যাথিত। ৮২ বছর বয়সে এই ঘটনার সম্মুখীন হওয়া তাঁর কাছে চরম সম্মানহানির। শুনানির নোটিস পেয়ে নির্বাচন কমিশনকে সম্মান জানিয়ে অসুস্থ শরীরে তিনি নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে সব নথি জমা দেন। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। যদিও ছোটে নবাবকে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আশ্বাস দিয়েছেন সর্বোতভাবে সাহায্য করার। কথায় কথায় তিনি দাবি করেছিলেন, নাম ‘মুছে দেওয়া হলেও’ তিনি ভোট দিতে যাবেন! যদি তাঁকে আটকানো হয়, তিনি তাঁদের শুভেচ্ছা জানিয়ে, তাঁদের জন্য প্রার্থনা করে ফিরে আসবেন।
মুর্শিদাবাদেও সকাল থেকে শুরু হয়েছে ভোটদান। তাহলে কি এদিন ভোটার তালিকায় নাম থাকা না সত্বেও ভোট দিতে যাচ্ছেন ছোটে নবাব? আজকাল ডট ইন-কে তিনি বললেন, “না, যাচ্ছি না। মারধর খাব নাকি? ভেবেছিলাম, ভোট দেওয়ার আবেদন করব বুথকেন্দ্রে... কিন্তু তারপর ভাবলাম যদি কোনও গন্ডগোল হয় তাহলে তার পুরো দায় এসে পড়বে আমার উপরে! এসব ভেবেই আর গেলাম না। এই বয়সে পৌঁছে জীবনে প্রথমবার এহেন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম। খুব খারাপ লাগছে...এটা কি আমার প্রাপ্য ছিল বলুন?”
‘ছোটে নবাব’ আজকাল ডট ইন-কে আরও বলেছিলেন মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্যান্য নবাবী স্থাপত্য সব আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হল। আমরা নবাব মীরজাফরের বংশধর। সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতীয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ তিনদিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেষে আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপে খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। আর তার বংশধরের আজ এই দশা!
এই পুরো ঘটনার নেপথ্যে কি কোনো প্রশাসনিক ত্রুটি? ছোটে নবাব-পুত্র ফাহিম এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “২০০২-এর তালিকায় বাবার নাম ছিল ‘মহম্মদ রেজা আলী মির্জা’ (সৈয়দ ছিল না), আমার নাম ছিল ‘সৈয়দ ফাহিম মির্জা’ (মহম্মদ ছিল না)। কমিশনের নিয়ম মেনে পরে দু’জনই নাম সংশোধন করি। যদিও এবার এসআইআরে আমাদের নাম প্রথমে ‘বিবেচনাধীন’ ছিল।”
















