বিভাস ভট্টাচার্য: তেল থেকে বস্ত্র উৎপাদন শিল্প, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে অগ্রাধিকার এখানকার ভূমি পুত্রদেরই। সেভাবেই এগোচ্ছে কাজ। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজের কেন্দ্র উত্তর ২৪ পরগণার অশোকনগর বিধানসভায় কর্মসংস্থান নিয়ে দাবি করলেন এই কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী নারায়ণ গোস্বামী। তাঁর কথায়, "অশোকনগর রেল গেটের পাশেই কল্যাণী স্পিনিং মিল। যেখানে ৩৬ একর জমিতে তৈরি হচ্ছে বস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন সংস্থা এখানে এসেছে। জেলা শাসকের উপস্থিতিতে তাঁদের সঙ্গে যে 'মিটিং' হয়েছে সেখানে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি দু'একটা বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া ছাড়া বাকি সমস্ত ক্ষেত্রেই অশোকনগর বিধানসভা এলাকার লোক নিতে হবে। এর কোনও অন্যথা চলবে না। ইতিমধ্যেই পরিকাঠামো প্রস্তুত। পুজোর আগেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।" 

বর্ধিষ্ণু এলাকা অশোকনগর। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের নাম এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। শিক্ষিত ও চাকুরিজীবী লোকের সংখ্যাও যথেষ্ট। ব্যবসা-বাণিজ্যর সঙ্গে জড়িত লোকের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। নারায়ণের কথায়, "এখানকার লোকজন প্রত্যেকেই নিজের কাজে থাকেন। অবসর সময়েও এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করার লোকজন খুব একটা পাওয়া যায় না। 'হাই প্রোফাইল' লোকজনের বাস। অনেকটাই সল্টলেকের মতো।" 

আর এই সল্টলেকের মতো এলাকায় দেশ এবং রাজ্য সরকারে উচ্চপদে চাকরির জন্য নির্বাচনের পরেই বিশেষ 'কোচিং সেন্টার' চালু করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন নারায়ণ। তাঁর কথায়, "নির্বাচনের পরেই নেতাজি শতবার্ষিকী মহা বিদ্যালয়ে আমি একটা কোচিং সেন্টার চালু করতে চলেছি। যেখানে ডব্লুবিসিএস থেকে শুরু করে রেল, ব্যাঙ্ক বা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদে চাকরির জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে একটা কোচিং সেন্টার চালু হচ্ছে। এই মুহূর্তে নাম বলব না কিন্তু এটুকু বলতে পারি যারা এখানে প্রশিক্ষণ দেবেন তাঁরা প্রত্যেকেই নামকরা ব্যক্তি।" 

এই এলাকায় সোনার গহনা রাখার বাক্স তৈরি একটা বড় রোজগারের মাধ্যম। বহু মানুষ এর সঙ্গে জড়িত। একটা 'হাব' হওয়ার কথাও হয়েছিল। সেটার কী খবর? নারায়ণের কথায়, "অশোকনগরে সোনার গহনা রাখার বাক্স যেমন আছে তেমনি রয়েছে শোলার মুকুট তৈরির শিল্প। রয়েছে শঙ্খ তৈরির কারিগরও। এই তিনটি ক্ষেত্রে এখানে হাব তৈরি হয়েছে। এগুলো আরও সুসংহত কীভাবে করা যায় তার জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও তৈরি হয়েছে। আর শুধুমাত্র তৈরি নয়, উৎপাদিত পণ্যের বিক্রির ব্যবস্থাও কিন্তু রাজ্য সরকারের তরফে করা হয়েছে। দেখুন একটা কথা বলছি মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে রাজ্যে যথেষ্টই কর্মসংস্থান হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।" 

দেশের খনিজ তেল উৎপাদনের মানচিত্রে অশোকনগরের নাম নিয়ে এই মুহূর্তে আলোচনা চলছে। এত কিছু প্রচার, নানা রকমের গল্পও শোনা যাচ্ছিল। এই মুহূর্তে তার খবর কী? কবে থেকে শুরু হবে এই উৎপাদনের কাজ? 

"আমার মনে হয় প্রশ্নটা কেন্দ্রের কাছে করলেই ভালো হয়।" জানালেন নারায়ণ। কেন? তাঁর অভিযোগ, "রাজ্য সরকার এর জন্য জমি দেওয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য সব রকমের সহযোগিতা করেছিল। আমি নিজে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের জমি যাতে তাঁরা এই কাজের জন্য 'লিজ'-এ দেন সেই ব্যবস্থাও করেছি। কিন্তু গিয়ে দেখুন প্রস্তাবিত ওই বাইগাছি এবং দৌলতপুরের জায়গায় 'গেট'-এ এখন বিরাট তালা ঝুলছে। দাঁড়িয়ে আছেন নিরাপত্তারক্ষী। মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা বারণ। অথচ এই নিয়ে গালভরা মিথ্যা কথা যেমন বলছেন কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী তেমনি বলছে বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তেল উৎপাদনের কাজে সহযোগিতার জন্য ওএনজিসি-কে ১৫ একর জমি বিনামূল্যে দিয়েছেন। আমি কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীকে অনুরোধ করব আপনি নিজে এসে একবার পরিস্থিতিটা দেখে যান।" 

তার মানে তেল উৎপাদন কবে হবে সেটা কেউই জানে না? নারায়ণ জানান, "ওএনজিসি বলছে মাটির নিচে যে গরম জলের স্তর রয়েছে সেখানে তাদের পাইপ গলে যাচ্ছে। এখন তো বিজ্ঞানের যুগ। তাঁরা যখন দেখছেন পাইপ গলে যাচ্ছে তখন গলে যাবে না এরকম পাইপ দিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ এটার কাজ শুরু হলে এলাকায় অনেক অনুসারী শিল্প হবে। এর পাশাপাশি আমি নিজে ওএনজিসি-কে জানিয়েছি এই শিল্পে কাজের প্রয়োজনে যত লোক লাগবে তার পুরোটাই এই বিধানসভা থেকে নিতে হবে। তাঁরা জানিয়েছেন, একমাত্র 'স্কিলড পার্সন'-এর যেখানে প্রয়োজন হবে সেই জায়গা ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে এখানকার লোকই নেওয়া হবে। জেনে রাখুন, নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির অনুমতি নিয়ে আমি ওএনজিসি'র সল্টলেকের অফিসে যাব এবং কথা বলব। যদি দেখি পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না তাহলে সোজা ওই সল্টলেকের অফিসেই অবস্থান বিক্ষোভে বসে পড়ব।" 

রাজনীতির বাইরেও আপনার একটা পরিচিতি রয়েছে শিল্পকলা চর্চায়। নাটকে অভিনয় বা নতুন নাটকের মঞ্চস্থ করেন আপনি। বিধায়ক ছাড়াও আপনি উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদের সভাপতি। সময় বের করেন কোথা থেকে? 

উত্তরে অশোকনগরের এই তৃণমূল প্রার্থী জানালেন, "ছোটবেলা থেকেই আমার এই দিকে ঝোঁক ছিল। ওটা আমার 'রিক্রিয়েশন'। সময়ের প্রশ্নে বলতে পারি, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে।" 

গতবার আইএসএফ এই কেন্দ্রে ভালোই টক্কর দিয়েছিল। এবারও সকাল থেকে রাত এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন আইএসএফ প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারও কি আইএসএফ আপনার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ? 

নারায়ণের দাবি, "আইএসএফ-এর প্রার্থী গ্রামে গিয়ে সাজছেন সংখ্যালঘু। সেখানে তাঁর নওশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে ছবি দেখা যাচ্ছে। আবার যখন শহরে ঢুকছেন তখন সেখানে তিনি হিন্দু হয়ে যাচ্ছেন। সেখানে আবার তাঁর ছবি দেখা যাচ্ছে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সঙ্গে।" 

নারায়ণের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তাপস ব্যানার্জি বলেন, "তৃণমূলের প্রার্থী নিজেই ফেজ টুপি পরে সংখ্যালঘু এলাকায় যান। আমার দুই ধর্মের প্রতিই শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু আমি মন্দির বা মসজিদ কোথাও যাই না। কারণ, আমি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করি না। আর একটা কথা বলছি। বিধায়ক থাকাকালীন তৃণমূল প্রার্থী না করেছেন কোনও হাব না করেছেন এই এলাকার যথাযথ উন্নয়নের কিছু কাজ। শুধু মিথ্যার বেসাতি করে যাচ্ছেন।" 

তাহলে এখানে নারায়ণ গোস্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বী কে? বিজেপি না আইএসএফ? খুব সহজভাবেই অশোকনগর বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থীর উত্তর, "জেতার বিষয়ে আমি ১০০ শতাংশ আত্মবিশ্বাসী। কারণ, এই এলাকার মানুষ জানেন আমি কী করেছি। ফলে কে দ্বিতীয় না তৃতীয় হচ্ছে তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।"