ভোটের বাংলায় লড়াই তো অনেক রকমের হয়, কিন্তু পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের এবারের লড়াই যেন সব সমীকরণকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। গঙ্গা পারের এই জনপদে এখন কান পাতলে কেবল তিন প্রার্থীর নাম ঘোরাফেরা করছে— একদিকে বিদায়ী বিধায়কের উত্তরাধিকার রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে এক সন্তানহারা মায়ের বিচার পাওয়ার জেদ, আর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক ‘তরুণ তুর্কী’, যাঁর পকেটে টান থাকলেও লড়াকু মেজাজে খামতি নেই। তিনি কলতান দাশগুপ্ত।
2
9
বামেদের বাজি এই যুবনেতাকে ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে জোর চর্চা। বিশেষ করে তাঁর নির্বাচনী হলফনামা প্রকাশ্যে আসতেই রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে। যে যুগে কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক না হলে ভোটে দাঁড়ানোর কথা ভাবা যায় না, সেখানে কলতানের হাতে নগদ বলতে পড়ে রয়েছে মাত্র ৮,৫০০ টাকা।
3
9
বিগত পাঁচ অর্থবর্ষে তাঁর আয়কর রিটার্নের খাতা বলছে ‘নিল’। দলের হোল-টাইমার হিসেবে পাওয়া সামান্য ভাতার ওপর যাঁর জীবন চলে, তিনি কীভাবে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মহীরুহদের মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কলতানের আত্মবিশ্বাস কিন্তু টলানো যাচ্ছে না।
4
9
তবে সম্পদের অভাব থাকলেও কলতানের হলফনামায় উপচে পড়ছে অন্য এক খতিয়ান— তা হল মামলার পাহাড়। আট-আটটি ফৌজদারি মামলা তাঁর ঘাড়ে, যার সিংহভাগই জুটেছে গত এক বছরের গণআন্দোলন থেকে।
5
9
আরজি কর কাণ্ডের পর যখন বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমেছিল তিলোত্তমা তিলোত্তমা চিৎকারে গোটা রাজ্য, তখন পানিহাটির এই বাম প্রার্থী ছিলেন সামনের সারিতে। স্বাস্থ্য ভবন থেকে বিকাশ ভবন, রাজপথের লড়াইয়ে পুলিশের খাতায় নাম উঠেছে তাঁর বারবার। সেই আন্দোলনের তেজকেই হাতিয়ার করে আবারও ‘রাত দখলের’ ডাক দিয়েছেন কলতান।
6
9
সাউথ সিটি কলেজের সেই হাসিখুশি সুবক্তা ছেলেটি, যে কিনা একসময় বাম ছাত্র রাজনীতির আঙিনায় পা রেখেছিল, আজ সে সিপিএমের মরা গাঙে জোয়ার আনার অন্যতম মুখ।
7
9
তাঁর নির্বাচনী লড়াইয়ে স্ত্রীর অবদানও অনস্বীকার্য, কারণ হলফনামা অনুযায়ী পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস তাঁর অর্ধাঙ্গিনীই। ঢাকুরিয়ার একটি ফ্ল্যাট আর ২৩ লক্ষ টাকার গৃহঋণের বোঝা সঙ্গী করেই এই দম্পতি লড়াই চালাচ্ছেন এক অসম যুদ্ধে।
8
9
কলতানের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আর লড়াইয়ের ময়দানে তাঁর উপস্থিতিকে পাথেয় করেই বামেরা ঘর গোছাতে শুরু করেছে। যে কেন্দ্রে একদিকে তৃণমূলের নির্মল ঘোষের ছেলের দাপট আর অন্যদিকে বিজেপি-র ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের আবেগ— সেই ত্রিমুখী লড়াইয়ে ‘শূন্য’ আয়ের এই বাম প্রার্থীর জনপ্রিয়তা শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সে কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটাই এখন পানিহাটির সবচেয়ে বড় রহস্য।
9
9
মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে সমস্যার সমাধানের যে বার্তা তিনি দিচ্ছেন, তাতে পকেটের জোরের চেয়েও গলার জোর আর আন্দোলনের জেদই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পানিহাটির তপ্ত পিচে এই লড়াই কি তবে নতুন কোনও ইতিহাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? উত্তর মিলবে ভোটবাক্স খুললেই।