আশিস ঘোষ 

দেশের প্রথম ভোট হয়েছিল ৭৪ বছর আগে। তারপর বদলে গিয়েছে কত কী। রাজনীতি,  রাজনীতির চালচলন, কায়দাকানুন। আর তারই সঙ্গে বদলে গিয়েছে ভোটের ধরনও। সেই সেকালের ব্যালট থেকে একালের ইভিএম, ভিভিপ্যাট। হাতে লেখা পোস্টার, লিথোয় ছাপা পোস্টার থেকে এখনকার অফসেটে ছাপা চকচকে পোস্টার, হোর্ডিং। এসে গিয়েছে ভোটযুদ্ধের নতুন হাতিয়ার সোশাল মিডিয়া। 

এত কিছু বদলের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিও কি বদলায়নি? সেকালে ভোটের প্রচারের কায়দা অনেকটাই যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে দলের আদবকায়দাও। আগে দলের লোকজনের কাছ থেকেই খবরাখবর নিতেন নেতারা। এখন রীতিমতো গাঁটের কড়ি খসিয়ে পেশাদারদের লাগিয়ে সার্ভে করিয়ে দলের অবস্থা থেকে সম্ভাব্য ফলের আন্দাজ করা হয়। সেই মতো ঠিক করা হয় কৌশল। প্রচারের লাইন। তারাই দলের কোনও নেতাকে প্রচারের তোড়ে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে একটা লার্জার দ্যান লাইফ চেহারা দেয়। চোখধাঁধানো সেই গুণকীর্তনে লোকের সামনে সেই নেতার চেহারাটা এতটাই অতিপ্রাকৃত যে, তিনি নিজেকে অযোনিসম্ভূত বলে দাবি করলেও ভক্তরা চোখ বুঁজে মেনে নেন।

আগে ভোটে জিততে দরকার হত কোনও নেতার আকর্ষণের থেকেও কোনও দলের নীতি আদর্শ। তখনও নেতাদের কথায় ভরসা করতেন মানু্ষজন। বিশ্বাস করতেন দলের কর্মসূচিতে। তাই টাকাপয়সা ঢেলে আলাদা করে ব্র্যান্ড তৈরি করার প্রয়োজনও মোটেই ছিল না। ব্র্যান্ড শব্দটা বাঙালি শুনল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে। ব্র্যান্ড বুদ্ধ। জ্যোতি বসুর শাসন থেকে আলাদা। কৃষিকে ভিত্তি করে শিল্পের দিকে মরিয়া দৌড় বুদ্ধদেবকে করে তুলেছিল পুঁজিবাদের পোস্টার বয়। সেই ব্র্যান্ড আখেরে বামফ্রন্টকে ডুবিয়েছে। আর বিজেপির মুখ কিংবা ব্র্যান্ড, একমেবাদ্বিতীয়ম নরেন্দ্র মোদি। লোকসভার ভোটে তিনি, পুরসভার ভোটেও সেই তিনিই। এনডিএ সরকার এখন কেবল মোদি সরকার।

তৃণমূলের ব্র্যান্ড গোড়া থেকেই মমতা ব্যানার্জি। কী বিরোধী নেত্রী, কী মুখ্যমন্ত্রী, তিনিই দলের মুখ। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন ২৯৪টি কেন্দ্রে তিনিই মুখ। বাংলা এমন ব্র্যান্ড কখনও পায়নি। এখন, তিন দফায় ১৫ বছর পর আবার যখন তৃণমূল ভোটের মুখোমুখি, তখন একটা প্রশ্ন আড়ালে আবডালে উঠছেই। এরপর কী? কথাটা উঠছে অভিষেকের জন্যই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের লেখায় মমতা আর অভিষেকের মধ্যে লড়াই নিয়ে বেশ কয়েক দিস্তে কাগজ ভরানো হলেও তার প্রকাশ বাইরে কখনই দেখা যায়নি। বরং এবারের প্রার্থিতালিকায় বোঝা গেল মমতা আর তাঁর সেকেন্ড ইন কম্যান্ডের বোঝাপড়ার চেহারাটা। দলের অভিজ্ঞদের অনেককেই রেখে বাদ দেওয়া হয়েছে ৭২ জনকে। শুধু বয়স নয়, সবার কাজকর্ম দেখে তালিকা তৈরি হয়েছে। 

প্রার্থীদের কাজকর্মের খতিয়ান দেখাটা ছিল অভিষেকের দায়িত্বে। তিনি নিজেই বারবার প্রকাশ্যে বলে এসেছেন পারফর্ম্যান্সের কথা। ফলে মমতার সমসাময়িক বয়স্ক নেতানেত্রীরা যেমন আছেন, তেমনই আছেন অচেনা কমবয়সীরা। বলতে গেলে সংখ্যায় তাঁরাই গরিষ্ঠ। তাঁদের বাছাইয়ে মাঠে নেমেছিল তৃণমূলের পেশাদার ভোটকুশলী সংস্থা। এটা আগে ছিল না। দেড় দশক নবান্নে কাটানোর পর নিঃসন্দেহে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা কোথাও কোথাও এখন জোরদার। তার মোকাবিলায় যেমন দলনেত্রীর জনপ্রিয়তা দরকার, তেমনই দরকার ছিল মানুষের অপছন্দের মুখগুলিকে তালিকা থেকে সরিয়ে ফেলা। এবং আস্তেধীরে পরের প্রজন্মকে সামনে তুলে আনা। সে কাজে অনেকটাই এগিয়েছে তৃণমূল।