কুয়াশার চাদরে ঢাকা পাহাড়ের কোলে যে এত বড় এক ট্র্যাজেডি লুকিয়ে থাকতে পারে, তা মুসৌরির 'লাম্বি দেহর খনি' না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। উত্তরাখণ্ডের এই শৈলশহরটি পর্যটকদের কাছে যতটা জনপ্রিয়, তার ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে এই পরিত্যক্ত চুনাপাথরের খনি— যা আজ ভারতের অন্যতম সবচেয়ে ভুতুড়ে বা অভিশপ্ত স্থান হিসেবে পরিচিত।
2
5
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই খনিতে যখন পুরোদমে কাজ চলত, তখন সুরক্ষার কোনও বালাই ছিল না। অতি মুনাফার লোভে শ্রমিকদের খনির ভেতরে কোনও রকম বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা বা মাস্ক ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করা হতো। ফলে বাতাসে ওড়া বিষাক্ত চুনাপাথরের ধুলো দিনের পর দিন জমতে থাকে শ্রমিকদের ফুসফুসে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় 'সিলিকোসিস'। অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে এই মারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক কাশির সঙ্গে রক্ত তুলতে তুলতে তীব্র যন্ত্রণার মধ্যে মারা যান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত খনিটি বন্ধ করে দেওয়া হলেও, এই গণমৃত্যুর ক্ষত আর কোনও দিন শুকায়নি। পুরো এলাকাটি রাতারাতি এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং আশেপাশের গ্রামগুলোও ভয়ে ফাঁকা হয়ে যেতে শুরু করে।
3
5
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই এলাকাটিকে ঘিরে দানা বাঁধতে থাকে একের পর এক অলৌকিক উপাখ্যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গভীর রাতে খনির জরাজীর্ণ কোয়ার্টার আর ভাঙা ছাদগুলোর আড়াল থেকে আজো মৃত শ্রমিকদের বুকফাটা আর্তনাদ এবং কান্নার শব্দ ভেসে আসে। বাতাসে নাকি ফিসফিসানি শুনতে পান অনেকেই। শুধু তাই নয়, এই খনি সংলগ্ন পাহাড়ি রাস্তায় প্রায়শই অদ্ভুত সব সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মেলে না। এমনকি বহু বছর আগে এই এলাকায় একটি হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ার পেছনেও অনেকে এখানকার নেতিবাচক অতিপ্রাকৃতিক শক্তিকে দায়ী করেন। লোকমুখে ঘোরে এক রহস্যময়ী ডাইনির গল্পও, যে নাকি মাঝরাতে ফাঁকা রাস্তায় একা গাড়িচালকদের বিভ্রান্ত করে খাদে ফেলে দেয়।
4
5
বিজ্ঞানের চোখে অবশ্য এই কান্নার আওয়াজ বা ছায়ামূর্তি স্রেফ পাহাড়ি খাদের তীব্র হাওয়া আর অন্ধকারের চোখের ভুল। পাহাড়ের গভীর খাঁজ ও সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যখন জোরে বাতাস বয়ে যায়, তখন এক ধরনের অদ্ভুত তীক্ষ্ণ শব্দের সৃষ্টি হয়, যা শুনতে কান্নার মতোই শোনায়। তবে অলৌকিকতা সত্যি হোক বা না হোক, প্রকৃতির কোলে শ্যাওলা ধরা এই জরাজীর্ণ কংক্রিটের কাঠামো আজো সেই হাজার হাজার বঞ্চিত শ্রমিকের নির্মম পরিণতির এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
5
5
দিনভর পর্যটকদের কোলাহল থাকলেও, সূর্য ডোবার পর এই বিস্তীর্ণ এলাকা এক অদ্ভুত এবং গা ছমছমে নিস্তব্ধতায় ডুবে যায়। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরাও সন্ধ্যার পর আর এই পথ মাড়াতে সাহস পান না। কিন্তু এই ভুতুড়ে তকমার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম অবহেলা এবং হাজার হাজার শ্রমিকের করুণ মৃত্যুর ইতিহাস।