আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতবর্ষের বামপন্থার ইতিহাসে আজ যেন এক বিষণ্ণ সূর্যাস্তের দিন। গত পাঁচ দশকের প্রথা ভেঙে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে বামপন্থী শিবির। দীর্ঘ ৫০ বছর পর এই প্রথম ভারতের মানচিত্রে এমন কোনও  রাজ্য থাকল না যেখানে একজন কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। কেরলে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকারের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে কার্যত ধসে পড়ল বামেদের শেষ দুর্গটিও। 

বাংলার মাটিতে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম জমানা আজও এক রেকর্ড। ত্রিপুরার পাহাড়েও ১৯৯৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা ২৫ বছর দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছে লাল ঝাণ্ডা। অন্যদিকে কেরলে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার বদলের প্রথা ভেঙে ২০২১ সালে ইতিহাস গড়েছিলেন বিজয়ন। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলের হাতে বাংলায় ২০১১-তে এবং বিজেপির ঝড়ে ২০১৮ ও ২০২৩-এ ত্রিপুরায় পরাজয়ের পর কেরলই ছিল শেষ আশা। আজ সেই কেরলের পতনে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

এই পরাজয় কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতা হারানো নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে বামেদের প্রাসঙ্গিকতা এবং হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতার ওপর এক বড় আঘাত। একসময় বামপন্থীরা তাঁদের নির্বাচনী শক্তির তুলনায় জাতীয় প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতেন। সিপিএম, সিপিআই, আরএসপি বা ফরওয়ার্ড ব্লকের মতো দলগুলো দিল্লি দরবারে নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশ দিত। বিশেষ করে ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৫৯টি আসন জিতে ইউপিএ-১ সরকারের ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছিল তারা। তৎকালীন মনমোহন সিং সরকারের পরমাণু চুক্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে বামেদের কড়া নজরদারি ও আপত্তি সেই সময়কার রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকেই এই গ্রাফ ক্রমশ নিম্নমুখী। ২০০৪ সালে যে সিপিএমের একারই ৪৩ জন সাংসদ ছিল, ২০০৯-এ বামেদের আসন সংখ্যা নেমে আসে ২৪-এ। ২০১৪ সালে তা ১০ এবং ২০১৯-এ এসে ৫-এ ঠেকে। বর্তমান লোকসভায় সিপিএম ও সিপিআই মিলিয়ে আসন সংখ্যা সাকুল্যে ছয়। এর বাইরে বিহার থেকে সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের দুজন প্রতিনিধি রয়েছেন। উদ্বেগের বিষয় হল, এই বর্তমান সাংসদদের মধ্যেও চারজন জিতেছেন তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-র হাত ধরে এবং একজন রাজস্থানে কংগ্রেসের সমর্থনে। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল বা ত্রিপুরার মতো একসময়ের শক্তিশালী ঘাঁটিগুলো থেকে আজ বামেদের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব কার্যত শূন্যের কোঠায়। 

একসময় যে বামপন্থীরা জাতীয় রাজনীতির দিশারি ছিলেন, আজ ক্ষমতার অলিন্দ থেকে তাঁদের এই প্রস্থান কেবল ভারতের নির্বাচনী মানচিত্রকেই বদলে দিল না, বরং সংসদীয় বামপন্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়ে গেল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে 'কমরেড'রা ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে লড়াই দেখেছেন, তাঁদের কাছে আজ এক লপ্তে সব দুর্গ হারিয়ে ফেলার এই ছবিটা মেনে নেওয়া সত্যিই যন্ত্রণার।