আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেরল বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এই আবহে সকলের নজর এখন মঞ্জেশ্বর কেন্দ্রের দিকে, যেখানে চতুর্থবারের মতো ভাগ্য পরীক্ষায় নেমেছেন বিজেপির প্রবীণ নেতা এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি কে সুরেন্দ্রন। তাঁর এই লড়াই কেবল একটি আসনের জয়-পরাজয় নয়, বরং কেরলে  বিজেপির অস্তিত্ব রক্ষার এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিগত দুটি নির্বাচনে জয়ের দোরগোড়া থেকে ফিরতে হয়েছে তাঁকে— ২০১৬ সালে ব্যবধান ছিল মাত্র ৮৯ ভোট এবং ২০২১ সালে ৭৪৫ ভোট। কিন্তু ২০২৬-এর এই মহারণে সুরেন্দ্রন অনেক বেশি প্রত্যয়ী। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি কেরলের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে যে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে এখন তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি।

সুরেন্দ্রনের মতে, কেরলের আপামর জনগণ ক্ষমতাসীন এলডিএফ (LDF) এবং প্রধান বিরোধী পক্ষ ইউডিএফ (UDF)—উভয় জোটের ওপরেই আস্থা হারিয়েছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম সরকার যেমন ব্যর্থ, তেমনই বিরোধী হিসেবে কংগ্রেসও চূড়ান্ত হতাশাজনক পারফরম্যান্স করেছে। ইউডিএফ-এর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তাদের ইশতেহারে মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা স্রেফ দেউলিয়া রাজনীতির নমুনা। যে কেরল স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (KSRTC) ইতিমধ্যেই কয়েক হাজার কোটি টাকার লোকসানে ধুঁকছে, সেখানে এই ধরনের অবাস্তব প্রকল্প কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে কংগ্রেসের কোনও  স্পষ্ট ধারণা নেই। এটি প্রমাণ করে যে উন্নয়নের প্রশ্নে তারা কতটা দিশেহারা।

বিজেপির ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুরেন্দ্রন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ত্রিশূর জয় এবং তার পরবর্তী সময়ে তিরুবনন্তপুরম পুরনিগমে অভাবনীয় সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, কেরলের মানুষ এখন প্রথাগত দ্বি-মেরু রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে কোনও  জোটই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং সরকার গঠনের চাবিকাঠি থাকবে বিজেপির হাতেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেখানে যেখানে বিজেপি একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছে, সেখানেই মানুষ কংগ্রেস বা বামেদের বদলে পদ্ম শিবিরকে বেছে নিচ্ছে। এই পরিবর্তনটি কেবল শহর কেন্দ্রিক নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন।

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সিপিপিআই(এম) এবং বিজেপির মধ্যে একটি ‘গোপন আঁতাঁত’-এর অভিযোগ তোলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সুরেন্দ্রন পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে বলেন, আসল সমঝোতা হয়েছে কংগ্রেস এবং বামেদের মধ্যে, বিশেষ করে সেই সব আসনগুলিতে যেখানে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নেমম বা কাজাকুট্টমের মতো আসনে যেখানে বিজেপি সরাসরি বামেদের সাথে সমানে সমানে লড়াই করছে, সেখানে রফার প্রশ্ন উঠছে কেন? তাঁর মতে, এই ‘গোপন ডিল’-এর তত্ত্ব আসলে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে ভোট ব্যাংক ধরে রাখার একটি সস্তা কৌশল মাত্র। সোনা পাচার কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে সবরীমালা ইস্যু—সব ক্ষেত্রেই তাঁর দল নিরবচ্ছিন্নভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি কেরলের মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে নিয়ে বিজেপির রণনীতি সম্পর্কেও বিস্তারিত জানিয়েছেন সুরেন্দ্রন। তিনি দাবি করেন, গত ১২ বছরে মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। মোদি সরকারের হজ নীতি এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের সুবাদে সম্প্রদায়ের মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে যে বিজেপি তাদের বিরোধী নয়। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন যে, এখন বিজেপি কর্মীরা মুসলিম পাড়ায় গেলে তাদের সাদরে গ্রহণ করা হয়, এমনকি ইফতারের দাওয়াতও দেওয়া হয়। অন্যদিকে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে এফসিআরএ (FCRA) সংশোধন নিয়ে যে ভয় ছড়ানো হয়েছিল, তাকেও তিনি কংগ্রেসের রাজনৈতিক কারসাজি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, কেরলের মানুষ এবার প্রথাগত রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এক ‘নতুন কেরল’ গড়ার লক্ষ্যে বিজেপিকেই নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে বেছে নেবে। সুরেন্দ্রনের এই আত্মবিশ্বাস ৪ঠা মে'র  ফলাফলে কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটাই দেখার।