আজকাল ওয়েবডেস্ক: তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি; এই অববস্থায় প্রার্থীরা চরম উৎকণ্ঠায় সময় গুনছেন। ভোটাররা তাঁদের হাতে সরকার গঠনের ভার তুলে দিয়েছেন কি না, তা দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন প্রার্থীরা। দক্ষিণী এই রাজ্যে এনডিএ এবং 'ইন্ডিয়া' জোট একে অপরের পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এবারের নির্বাচনের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিনেতা থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা বিজয় এবং তাঁর দল 'তামিলগা ভেট্রি কাজাগাম' (টিভিকে)। লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম তামিলনাড়ুর নির্বাচনী রাজনীতিতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের ঝাঁঝ। 

বিজয় এর আগে ডিএমকে -কে তাঁর দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং বিজেপি-কে আদর্শগত প্রতিপক্ষ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে, ভোট গণনার দিন যদি জনমত সমীক্ষার পূর্বাভাসগুলো সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে টিভিকে এবার তামিল মসনদের 'নির্ণায়ক শক্তি' বা 'কিংমেকার'। 

নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর যদি বিজয় সেই 'অসম্ভবকে সম্ভব' করে তুলতে পারেন, তবে সম্ভাব্য যে কয়েকটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, নীচে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো

**সম্ভাব্য পরিস্থিতি ১**
'অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া'-র বুথফেরৎ সমীক্ষার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৩৪ সদস্যবিশিষ্ট তামিলনাড়ু বিধানসভায় ৯৮ থেকে ১২০টি আসনে জয়লাভ করে টিভিকে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। যদি এই পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নেয়, তবে সরকার গঠনের লক্ষ্যে বিজয় কংগ্রেস (যারা ২৮টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল) এবং অন্যান্য ছোট দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

নির্বাচনের আগেই কংগ্রেস নেতা প্রবীণ চক্রবর্তী বিজয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তবে, সেই আলোচনায় কোনও ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

নির্বাচনী প্রচারের সময় টিভিকে প্রধান বিজয়ের বক্তৃতায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে খুব একটা কঠোর সমালোচনা শোনা যায়নি। এমনকি বিজয়ের বাবা এসএ চন্দ্রশেখরও এর আগে কংগ্রেসের প্রতি জোট গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

**সম্ভাব্য পরিস্থিতি ২**
যদি টিভিকে সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছে যায়, তবে বিজয় সমর্থনের জন্য এআইএডিএমকে -এর দিকে হাত বাড়াতে পারেন। এআইএডিএমকে বর্তমানে তামিলনাড়ুতে এনডিএ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে, এই পথটি মোটেও সহজ বা মসৃণ নয়। বিজয় এবং টিভিকে-র শীর্ষস্থানীয় নেতারা বারবার এ কথা বলেছেন যে, তাঁরা কোনওভাবেই "সাম্প্রদায়িক শক্তির" সঙ্গে জোট বাঁধবেন না। তাঁদের এই অবস্থানকে ব্যাপকভাবে এমন একটি ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা বিজেপি-কে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত যেকোনও সম্ভাব্য জোটের সম্ভাবনাকে কার্যত নাকচ করে দেয়।

একই সঙ্গে, বিজয় এআইএডিএমকে-র 'দ্রাবিড়ীয় ঐতিহ্য'-এর প্রতিও ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি তিরুচিরাপল্লিতে এমজিআর-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, যার মাধ্যমে তিনি উভয় দলের আদর্শগত মিল বা অভিন্নতার বিষয়টিই মূলত তুলে ধরেছিলেন। যদিও এটি এআইএডিএমকে-এর সঙ্গে সম্ভাব্য বোঝাপড়ার একটি পথ খোলা রাখছে, তবুও বিজয় দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে তিনি তাঁর "আদর্শের প্রশ্নে কোনও আপস করবেন না" - যার মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি বিজেপির কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন।

বিজয় চাইলে এআইএডিএমকে কিংবা এমনকি বিজেপির মতো দলগুলোর কাছ থেকে 'বাইরের সমর্থন' নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করে দেখতে পারেন। এক্ষেত্রে দলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন হবে না। এ ধরনের একটি ব্যবস্থার ফলে টিভিকে  একদিকে যেমন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ অটুট রাখতে পারবে, তেমনি সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও নিশ্চিত করতে পারবে।

২০১৩ সালে দিল্লিতেও একই ধরনের একটি মডেল দেখা গিয়েছিল। সে সময় আম আদমি পার্টি (আপ) একক বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও তাদেরই প্রতিদ্বন্দ্বী দল কংগ্রেসের বাইরের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে সরকার গঠন করেছিল। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে পরিচালিত সেই পরীক্ষাটি অবশ্য স্বল্পস্থায়ী প্রমাণিত হয়েছিল, যা এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত অস্থিতিশীলতাকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল।

**সম্ভাব্য পরিস্থিতি ৩**
যদি ডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং টিভিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন নিয়ে আবির্ভূত হয়, তবে নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণগুলো এক কৌতূহলোদ্দীপক মোড় নিতে পারে। একটি সম্ভাবনা হতে পারে যে, টিভিকে কোনও বিরোধী জোটকে সমর্থন জানাবে—যদিও বিজয় এখন পর্যন্ত কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও জোট গঠনের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন।

এমন পরিস্থিতিতে, তিনি ডিএমকে সরকারকে সমর্থন জানানোর কথা বিবেচনা করতে পারেন, অথবা সেই সরকারের ভেতরেই নিজের জন্য কোনও ভূমিকা (সম্ভবত উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদ) নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারেন। ভারতীয় রাজনীতিতে এর আগেও এমন নজির দেখা গিয়েছে- বিশেষ করে কর্নাটকে, যেখানে জনতা দল (সেকুলার)-এর এইচডি কুমারস্বামী কম সংখ্যক আসন জিতেও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, কারণ বিজেপি-কে ক্ষমতার বাইরে রাখতে কংগ্রেস তাঁকে সমর্থন জানিয়েছিল।

তবে, তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। কর্নাটকে যেখানে কংগ্রেস কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছিল, সেখানে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-ই হলো প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। এমন কোনও রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সম্ভবত ডিএমকে-র হাতেই ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যা বিজয় এবং টিভিকে-র জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল এবং কম অনুমানযোগ্য করে তুলবে।

**সম্ভাব্য পরিস্থিতি ৪**
যদি এআইএডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তবে বিজয় এনডিএ -র সঙ্গে জোট বাঁধতে অনিচ্ছুক হতে পারেন, বিশেষ করে তাঁর ঘোষিত আদর্শগত অবস্থানগুলোর কথা বিবেচনা করলে। তিনি বর্তমানে অন্যান্য নানামুখী চাপের মধ্য দিয়েও যাচ্ছেন। যার মধ্যে রয়েছে তাঁর চলচ্চিত্র ‘জান নাগায়ান’-এর মুক্তির বিষয়টি এবং কারুর পদদলিত হওয়ার ঘটনায় (যা ৪১ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল) সিবিআই -এর চলমান তদন্ত।

তবে একথাও ঠিক যে, রাজনীতিতে প্রায়শই অপ্রত্যাশিত বা অসম্ভাব্য জোট তৈরি হতে দেখা যায়। নির্বাচনের পরবর্তী কোনও জটিল বা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরিস্থিতিতে, বিজয় হয়তো এমকে স্ট্যালিনকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে এআইএডিএমকে-কে সমর্থন জানানোর কথা বিবেচনা করতে পারেন। এমনকি এর জন্য তাঁকে নিজের পূর্ববর্তী অবস্থান বা নীতি পরিবর্তন করতে হলেও।

**সম্ভাব্য পরিস্থিতি ৫**
যদি বিজয় এককভাবে পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন, তবে তা হবে একটি ঐতিহাসিক ফলাফল। যা নির্বাচনের পরবর্তী জোট গঠন বা আসন-সংখ্যার হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি দূর করে দেবে।

দৃঢ় আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করে টিভিকে-র কার্যনির্বাহী কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কেএ সেনগোট্টাইয়ান দাবি করেছেন যে, তাঁদের দল অন্তত ১৮০টি আসনে জয়লাভের পথে এগিয়ে চলেছে। এআইএডিএমকে-র সঙ্গে কোনও জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “বিধানসভায় কোনও ‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’ তৈরির প্রশ্নই ওঠে না। আমরা ১৮০ থেকে ২০০টি আসন জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি।”