আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের একজন গ্রাহক লকারের জন্য আবেদন করতে এসেছিলেন। তিনি লকারের সঙ্গে একটি ফিক্সড ডিপোজিট করা সহ আনুষ্ঠানিক শর্তগুলো পূরণ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু একটি সহজ আবেদন প্রক্রিয়ার পরিবর্তে, তাঁকে দু'টি বিকল্প দেওয়া হয়। প্রায় ১ লক্ষ টাকার একটি ইউলিপ কিনুন। অথবা প্রায় ৪০,০০০ টাকার একটি টার্ম ইন্স্যুরেন্স পলিসি নিন। তাঁকে বলা হয়, কেবল তখনই তাঁর লকারের আবেদন বিবেচনা করা হবে।

কোটাক মাহিন্দ্রা ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকা ওই গ্রাহক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) কর্তৃপক্ষের ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর কথায়, তিনি প্রয়োজনীয় ফিক্সড ডিপোজিট করতে ইচ্ছুক, কিন্তু অন্য়ান্য কিছুতে বিনিয়োগে তিনি রাজি নন। ফলে তাঁর লকারের আবেদনটি নাকচ করে দেওয়া হয়।

বিষয়টি উদ্বেগজনক, লকারের আবেদনের সঙ্গে এই ধরনের কোনও শর্ত নিয়মের অংশ নয়।

আরবিআই-এর নিয়মে কী বলা আছে?
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া লকার কীভাবে বরাদ্দ করা উচিত, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা দিয়েছে। সিনিয়র রেজিস্টার্ড ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজার (আরআইএ) এবং সহজ মানি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিষেক কুমার বলেন, “ব্যাঙ্ক লকার বরাদ্দের সঙ্গে অন্য কোনও আর্থিক পণ্য বা পরিষেবা কেনার জন্য চাপ দেওয়ার বিষয়টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।” 

আরবিআই-এর নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র একটি টার্ম ডিপোজিট বাধ্যতামূলক করাতে পারে, যা তিন বছর পর্যন্ত লকারের ভাড়া এবং জরুরি অবস্থায় লকার ভাঙার খরচ বহন করবে।

অভিষেক কুমারের কথায়,  “বিমা, মিউচুয়াল ফান্ড বা অতিরিক্ত বিনিয়োগের যেকোনও দাবি এই নিয়ন্ত্রক নিয়মগুলোর লঙ্ঘন।”

বাস্তবে গ্রাহকরা যা দেখছেন
এই নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও, গ্রাহকরা বলছেন বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিষেক কুমার বলেন, “লকার বরাদ্দের গোপন শর্ত হিসেবে গ্রাহকদের প্রায়শই বিমা বা অন্যান্য বিনিয়োগ পণ্য কেনার জন্য চাপ দেওয়া হয়।”

অভিষেকের দাবি, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তাঁর কথায়, “এই অভ্যাসটি তুলনামূলকভাবে ব্যাপক, বিশেষ করে উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন শহুরে শাখাগুলিতে, যেখানে লকারের স্বল্পতা আবেদনকারীদের উপর কর্মীদের প্রভাব খাটানোর সুযোগ করে দেয়।”

লকারের স্বল্পতার কারণে, গ্রাহকদের প্রায়শই একটি কঠিন প্রস্তাবের মুখোমুখি হতে হয়। হয় অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করা অথবা অতিরিক্ত শর্তে রাজি হওয়া। অভিষেক বলেন, “অনেক গ্রাহক শুধুমাত্র দীর্ঘ অপেক্ষার সময় বা সম্ভাব্য প্রত্যাখ্যান এড়াতে এই অলিখিত দাবিগুলো মেনে নেন।”

কেন লকারকে প্রভাব খাটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে
ব্যাঙ্কগুলোর মধ্যে লকার পরিষেবার অবস্থান এর নেপথ্যের কারণ। অভিষেক কুমার বলেন, “আমাদের অভিজ্ঞতায়, ব্যাঙ্কের শাখার কর্মীরা এই পণ্যগুলো কেনার জন্য প্রধানত চাপ দেন কারণ লকার পরিষেবাগুলোতে লাভের পরিমাণ কম এবং এতে প্রশাসনিক খরচ অনেক বেশি।”
অন্যদিকে, আর্থিক পণ্য বিক্রি করলে সরাসরি আয় হয়। বিমা বা ইউলিপ-এর মতো থার্ড-পার্টি পণ্য বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিশন আয় হয় এবং এটা কর্মীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী মাসিক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়তা করে।

কুমার বলেন, “গ্রাহকদের উচ্চ আয়ের পণ্যগুলিতে ‘আকৃষ্ট’ করার জন্য প্রায়শই লকারকে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাঙ্কের শাখা-কর্মীরা।”

কখন এটা সমস্যার?

ব্যাঙ্কগুলো যে আর্থিক পণ্য সরবরাহ করে, তা মূল বিষয় নয় — বরং সেগুলোকে পরিষেবার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হয়, সেটাই আসল বিষয়।

যখন লকারের মতো একটি মৌলিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি গ্রাহকের কোনও পণ্য কেনার সম্মতির ওপর নির্ভর করে, তখন তা ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এটি গ্রাহকদেরও একটি কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে, বিশেষ করে যখন তারা নিয়মকানুন সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নাও থাকতে পারেন।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের কী করা উচিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রাহকদের এই ধরনের শর্ত মেনে নেওয়া উচিত নয়। অভিষেক কুমার বলেন, “একজন গ্রাহক লকার নেওয়ার সময় কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অস্বীকার করতে পারেন এবং অবিলম্বে সেফ ডিপোজিট লকার সংক্রান্ত আরবিআই-এর মাস্টার ডিরেকশনের কথা উল্লেখ করতে পারেন। আবেদনকারীর উচিত ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে দাবিটি জানাতে অনুরোধ করা অথবা এমন নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ নীতিমালার দিকে নির্দেশ করা, যা এই ধরনের ক্রয়কে বাধ্যতামূলক করে।”

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এই ধরনের শর্তগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয় না। অভিষেকের কথায়, "প্রস্তাবে সম্মত হওয়ার চেয়ে সাধারণত প্রত্যাখ্যান করা এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানোই শ্রেয়, কারণ ভুলভাবে বিক্রির কাছে নতি স্বীকার করলে এই ধরনের কার্যকলাপ চলতে উৎসাহিত হয়।”

যেসব সতর্ক সংকেতের দিকে নজর রাখতে হবে
গ্রাহকরা কিছু নির্দিষ্ট সতর্ক সংকেত দেখে সম্ভাব্য সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারেন। কুমার বলেন, “সঠিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যাঙ্কের একটি স্বচ্ছ অপেক্ষমাণ তালিকা বজায় রাখা এবং একটি অপেক্ষমাণ তালিকা নম্বর-সহ প্রাপ্তিস্বীকারপত্র প্রদান করা প্রয়োজন।”

যদি এমনটা না হয়, তবে তা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেতগুলোর মধ্যে রয়েছে, কোনো বিনিয়োগ করা হলেই কেবল লকার পাওয়া যাবে বলে কর্মীদের দাবি করা অথবা লকার বরাদ্দের রেজিস্টার দেখাতে অস্বীকার করা।

আরেকটি সতর্ক সংকেত হল অতিরিক্ত আর্থিক শর্ত আরোপ করা।

অভিষেক বলেন, “স্থায়ী আমানতের জন্য তিন বছরের ভাড়ার সমপরিমাণ অর্থ এবং লকার খোলার চার্জের চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করা হলে, তা নিয়ম লঙ্ঘনের একটি বড় লক্ষণ।” 

ব্যাঙ্ক লকার দিতে অস্বীকার করলে কী হবে?
যেসব গ্রাহক মনে করেন যে তাঁদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করা হয়েছে, তাঁদের জন্য কিছু উপায় রয়েছে। “গ্রাহকদের প্রথমে ব্যাঙ্কের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা উচিত। 

যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো যেতে পারে। যদি ব্যাঙ্ক ত্রিশ দিনের মধ্যে কোনও সন্তোষজনক সমাধান না করে, তবে গ্রাহক তার অভিযোগটি ব্যাঙ্কের ‘প্রধান নোডাল অফিসার’ অথবা ‘আরবিআই ওমবডসম্যান’-এর কাছে উত্থাপন করতে পারেন।”

এক্ষেত্রে একটি অনলাইন বিকল্পও রয়েছে।
একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করার লক্ষ্যে, ‘আরবিআই কমপ্লেইন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (RBI Complaint Management System) পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে।

লকারের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর প্রাপ্যতাও যখন সীমিত হয়ে আসছে, তখন লকার বরাদ্দের পদ্ধতিটি এখন লকারের নিরাপত্তার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদিও এ সংক্রান্ত নিয়মকানুনগুলো বেশ স্পষ্ট, তবুও নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধানটি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।

ব্যাঙ্ক লকারের মতো একটি অতি সাধারণ পরিষেবার প্রাপ্যতা যখন গ্রাহকের অন্য কোনও পণ্য বা সেবা কেনার আগ্রহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তা একটি বৃহত্তর প্রশ্নের জন্ম দেয়। লকার কি এখনও কেবলই একটি ‘সেবা’ হিসেবেই বিদ্যমান, নাকি এটা ধীরে ধীরে একটি ‘বিক্রয়-কৌশল’-এ পরিণত হচ্ছে?