আজকাল ওয়েবডেস্ক: বঙ্গ রাজনীতিতে মদ বা সুরা যে বহু দিন ধরেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা—তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোটের আগের রাতে মদ বিলির অভিযোগ অতীতেও উঠেছে, আবার বর্তমান শাসনকালেও বিরোধীদের অভিযোগ, রাজস্ব বাড়াতে মদের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। এ বার সেই সুরা জড়িয়ে পড়ল নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়াতেও।

ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্দেশ্যে চলা এসআইআরের শুনানিতে এক ভোটারের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে হুগলির হরিপালের  এক বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) যে মন্তব্য লিখেছেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে প্রশাসনিক মহলে। সংশ্লিষ্ট নথিতে তিনি লিখেছেন—ভোটারটি ‘মদ্যপানের ঘোরে ভুলে গিয়েছিলেন’ (ইংরেজিতে লেখা—“Forgot drinking wine”)।

নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ওই লিখিত প্রতিবেদনের কপি সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে। তবে গোপনীয়তার কারণে বিএলও-র নাম, সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্র বা ওই ভোটারের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।

কেন এমন মন্তব্য?

সংশ্লিষ্ট বিএলও-র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন, ভাষা নির্বাচনে হয়তো সংযম দেখানো উচিত ছিল। তাঁর কথায়,
“হয়তো এভাবে লেখা ঠিক হয়নি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে রাগের মাথায় লিখে ফেলেছি। আমায় কার্যত পাগল করে দিয়েছিল।”

ঘটনার সূত্রপাত প্রথম শুনানির দিন। বিএলও জানান, নির্ধারিত তারিখে ওই ভোটার হাজির হননি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাশের গ্রামে এক জনের মৃত্যু হওয়ায় তিনি শ্মশানে গিয়েছিলেন। অভিযোগ, সেখানে ‘ফ্রি’ মদ পাওয়ার লোভেই তিনি শুনানি এড়িয়ে যান।

হুগলির ওই গ্রামীণ এলাকায় মৃতদেহ সাধারণত বৈদ্যবাটি হাতিশালা ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে নিকটবর্তী বৈদ্যুতিক চুল্লি রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শ্মশানে যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট কয়েকটি মোড়ে শববাহী গাড়ি দাঁড় করিয়ে শোকযাত্রীরা মদ্যপান করেন—এ রীতি নাকি বহুদিনের। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই খরচ বহন করেন মৃতের পরিবারের সদস্যরাই। বিএলও সেই প্রথাকেই ইঙ্গিত করে প্রতিবেদনে ‘ফ্রি-তে মদ খাওয়ার লোভ’ কথাটি উল্লেখ করেছেন।

প্রথমবারের পর দ্বিতীয়বারও শুনানিতে হাজির হননি ওই ভোটার। বিএলও-র দাবি, সেবারও তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, তৃতীয়বার শুনানির আগে কমিশনকে জানাতে হয় কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আগের দু’বার অনুপস্থিত ছিলেন। তখনই ক্ষুব্ধ হয়ে বিএলও রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় লিখে দেন ‘মদ্যপানের ঘোরে ভুলে গিয়েছেন’।

তাঁর কথায়, “এ যেন আমার ব্যক্তিগত দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁকে হাজির করানো। এতবার ডাকার পরও না এলে হতাশা তো হবেই।” যদিও শেষ পর্যন্ত তৃতীয় শুনানিতে ওই ভোটার উপস্থিত হন। সেখানে তিনি দাবি করেন, আগেরবার তিনি তারাপীঠে পুজো দিতে গিয়েছিলেন। তবে বিএলও-র বক্তব্য, তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানেন সেই দাবি সত্য নয়। “ওঁকে আমি প্রতিদিন এলাকায় দেখেছি। তা সত্ত্বেও শুনানিতে আসেননি,” বলেন তিনি।

একই বিধানসভা এলাকার অন্য একটি বুথেও এক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে অন্য এক বিএলও এক ভোটারের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে ‘Drunker’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যদিও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আরও এক ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে ‘বমি’। তবে তার পেছনে কী কারণ, তা উল্লেখ করা হয়নি।

ঘটনাচক্রে, সংশ্লিষ্ট বিধানসভা এলাকায় চোলাই মদের একাধিক ভাটি রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। মাঝেমধ্যে স্থানীয় মহিলারা দল বেঁধে সেই ভাটিগুলিতে ভাঙচুর চালান। বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, প্রশাসনের নীরব মদতেই এসব বেআইনি ভাটি টিকে রয়েছে।

ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই ধরনের মন্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট বিএলও ব্যক্তিগত ক্ষোভের কথা স্বীকার করেছেন, তবু প্রশাসনিক নথিতে এমন ভাষা ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বড় বিতর্ক ডেকে আনতে পারে বলেই মনে করছেন অনেকে।

এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের যে চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়, এই ঘটনায় তারও এক ঝলক সামনে এল। কিন্তু সেই চাপ সামলাতে গিয়ে সরকারি নথিতে আবেগের বহিঃপ্রকাশ কতটা যুক্তিযুক্ত—এখন সেটাই আলোচনার কেন্দ্রে।