আজকাল ওয়েবডেস্ক: দোল, বসন্ত উৎসব উদযাপন। এই উদযাপনের সাক্ষী থাকতে প্রতিবছর বহু মানুষ এই সময়টায় শান্তিনিকেতন যান। কিন্তু গত কয়েকবছরে ছবিতা বলদেছে কিছুটা। সেই রেশ ধরেই, এবারেও দোলের দিন হচ্ছে না বসন্ত উৎসব, জানালেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীরকুমার ঘোষ। বুধবার শান্তিনিকেতনের সেন্ট্রাল লাইব্রেরীর কনফারেন্স হলে আয়োজিত একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন যতক্ষণ না মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত, বিগত পাঁচ বছর ধরে যেভাবে হয়ে আসছে, সেভাবেই হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে চোখের সামনে বিশ্বভারতীকে তো ধ্বংস হতে দিতে পারি না।' যদিও এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। প্রাক্তনী ও আশ্রমিকরা বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও পর্যটকদের কিছুটা হলেও মন খারাপ। তবে দোলের দিন, বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে বসন্ত উৎসব আয়োজন না হলেও বোলপুর পুরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডে কবিগুরুর ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান উদযাপন করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠার সূচনা লগ্ন থেকে বসন্ত উৎসব অন্যতম ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। একটা সময় দোল পূর্ণিমার দিনে বসন্ত উৎসব আয়োজন করতো কর্তৃপক্ষ। তবে, বছরের পর বছর যেভাবে ভিড় বাড়ছিল তাতে ক্যাম্পাসের স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয় কর্তৃপক্ষ। এর মাঝে বহিরাগতদের ঠেকাতে পরীক্ষামূলকভাবে ক্যাম্পাসের বাইরে মেলার মাঠে বসন্ত উৎসব আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু প্রবল গরমে অনেক পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পুনরায় অনুষ্ঠানটি ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। তবে ২০১৯ সালের বসন্ত উৎসবে পর্যটকদের ভিড় কার্যত জনসমুদ্রের চেহারা নেয়। ভিড়ের চোটে কয়েক ঘন্টার জন্য বোলপুর শহর কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়। ওই বছরই সর্বসাধারণের জন্য শেষবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানটি হয়েছিল। এরপর ২০২০ সালে করোনার কারণে প্রস্তুতি নিয়েও শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায় ওই অনুষ্ঠান। তারপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বসন্ত উৎসব দোল পূর্ণিমার পরিবর্তে আগে বা পরে ঘরোয়াভাবেই আয়োজন করে আসছে। আর বর্তমানে বিশ্বভারতী ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসাবে স্বীকৃত। তাই ক্যাম্পাসের মূল্যবান স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলির পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপত্তার সঙ্গে আপোষ করতে রাজি নয় বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। তাই এ বছরও দোলের দিনের পরিবর্তে তার আগে ঘরোয়াভাবে বসন্ত উৎসব আয়োজন করা হবে, সেখানে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত থাকবে বলে বিশ্বভারতীর এক আধিকারিক জানিয়েছেন। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য মেনে বিধিসম্মত পোশাক পরে অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পাবেন নির্দিষ্ট ও নিমন্ত্রিত অতিথিরা।
মূলত, বিশ্বভারতীর বসন্ত উৎসবের দিন ভোর পাঁচটায় হয় বৈতালিক। এরপর সকাল সাতটায় শান্তিনিকেতন গৃহের সামনে থেকে “ওরে গৃহবাসী” গানে শোভাযাত্রা শুরু হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার পড়ুয়া অংশগ্রহণ করেন। এরপর পাঠভবন, শিক্ষাসত্র, পল্লি সম্প্রসারণ কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মী, সঙ্গীত ভবন ও অন্যান্য বিভাগের পড়ুয়ারা রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। সন্ধ্যায় সঙ্গীত ভবনের উদ্যোগে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয়। একটা সময় এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান দেখতে রাজ্য তো বটেই, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় করতেন। কিন্তু পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় ও দর্শনার্থীদের একাংশের বেলেল্লাপনার কারণে অত্যন্ত বিরক্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাই ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার স্বার্থে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষ। তবে প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ঐতিহ্য রক্ষায় কোনও কার্পণ্য করা হবে না বলেও তিনি জানিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, এদিন বিশ্বভারতীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের তালিকা তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। সেখানেই তিনি বসন্ত উৎসবের বিষয়ে সকলকে অবগত করেন।
