আজকাল ওয়েবডেস্ক: বঙ্গোপসাগরের বুকে সমুদ্রের ঢেউ, জলোচ্ছ্বাস ও আবহাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে অত্যাধুনিক যন্ত্রটি দিনরাত কাজ করত, সেই ‘ওয়েভ রাইডার বয়া’ই এবার রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ। দীঘা উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রে স্থাপন করা এই বয়ার সঙ্গে গত এক সপ্তাহ ধরে আর কোনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। সিগন্যাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে জোর তল্লাশি। হায়দরাবাদ থেকে আসা বিজ্ঞানীদের একটি বিশেষ দল বর্তমানে বকখালি, গঙ্গাসাগর ও কাকদ্বীপ উপকূল জুড়ে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছেন।
জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে ভারত সরকারের সমুদ্র তথ্য ও পরিষেবা সংস্থা INCOIS, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মৎস্য দপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এই অত্যাধুনিক ‘ওয়েভ রাইডার বয়া’টি সমুদ্রে বসানো হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা, স্রোতের গতি, বাতাসের প্রবাহ, জলোচ্ছ্বাস এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করা। এই তথ্যের ভিত্তিতেই মৎস্যজীবীদের জন্য সময়মতো সতর্কবার্তা পাঠানো হতো। ফলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজার হাজার মৎস্যজীবীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই যন্ত্রটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের দাবি, সমুদ্রের তলায় একটি ভারী কংক্রিটের বোল্ডারের সঙ্গে লোহার তারের দড়ি দিয়ে বয়াটি শক্তভাবে বাঁধা ছিল। কিন্তু গত ২৯ জুন বঙ্গোপসাগরে প্রবল জলোচ্ছ্বাস এবং উত্তাল সমুদ্রের কারণে সেই তারের দড়ি ছিঁড়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে। এরপর থেকেই বয়াটি ভেসে যায় এবং তার পাঠানো সিগন্যাল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দেখেন, যেখানে বয়াটি থাকার কথা ছিল, সেখানে আর সেটির কোনও অস্তিত্ব নেই।
এই বয়াটিতে একাধিক অত্যাধুনিক সেন্সর ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাংশ বসানো ছিল। সমুদ্রের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তা সরাসরি গবেষণা কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল এতে। শুধু গবেষণার কাজেই নয়, দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস এবং মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তার জন্য এই তথ্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই বয়াটি হারিয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে বিজ্ঞানী মহলে।
গত রবিবার থেকেই হায়দরাবাদ থেকে আসা বিজ্ঞানীদের বিশেষ দল তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে বকখালি, গঙ্গাসাগর এবং কাকদ্বীপ উপকূলবর্তী এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করেছেন। অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং যন্ত্র এবং অনুসন্ধান সরঞ্জাম ব্যবহার করেও এখনও পর্যন্ত বয়ার কোনও সন্ধান মেলেনি। এর মধ্যে প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবল বৃষ্টি এবং উত্তাল সমুদ্র তল্লাশি অভিযানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের গভীরে যেতে পারছেন না বলেও জানা গিয়েছে।
গবেষক ভরত কুমার জানিয়েছেন, বর্তমানে বয়াটি থেকে কোনও ধরনের সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উপায়ে অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করা হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও তথ্য মেলেনি। ফলে অনুমান করা হচ্ছে, বয়াটি হয়তো অনেক দূরে ভেসে গিয়েছে অথবা অন্য কোনও কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, বয়াটি উদ্ধারের জন্য সুন্দরবন ও দক্ষিণবঙ্গের উপকূলবর্তী এলাকার মৎস্যজীবীদের সহযোগিতা চেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আবেদন, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে যদি কেউ গোলাকার ভাসমান এই যন্ত্রটি দেখতে পান, তাহলে সেটিকে নষ্ট না করে বা অন্যত্র সরিয়ে না নিয়ে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর অথবা গবেষণা কেন্দ্রকে খবর দিতে হবে। বিজ্ঞানীদের আশা, মৎস্যজীবীদের সহযোগিতাতেই হয়তো দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হবে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটি। কারণ, এই একটি বয়া শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং সমুদ্রে কর্মরত হাজার হাজার মৎস্যজীবীর নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।















