মনিরুল হক, কোচবিহার: কাজের অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক টেনশনের জেরে কোচবিহারে এক বিএলও’র মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল। মৃতের নাম, আসিস ধর। তাঁর বাড়ি কোচবিহারের বানেশ্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের ইছামারি এলাকায়। গতকাল শুক্রবার রাতে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে। তবে পরিজনদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত কাজের চাপ ও মানসিক চাপের কারণেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সম্প্রতি এসআইআর সংক্রান্ত কাজ নিয়ে প্রবল চাপের মধ্যে দিন কাটাছিল আসিস ধর-এর। সময়মতো বিশ্রাম বা স্বস্তির সুযোগ না পাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরিবারের এক সদস্য জানান, মৃত্যুর আগে তিনি একাধিকবার টেনশনের কথা বলেছিলেন। এমনকী তিনি নিজের মাকে বলেছিলেন, 'আমি এত চাপ নিতে পারছি না।' সেই কথাই আরও বেশি করে নাড়া দিচ্ছে পরিবারকে। 

মৃত্যুর খবর পেয়ে আসিস ধরের বাড়িতে যান কোচবিহার জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানান। এই ঘটনায় সরব হয়ে অভিজিৎ বলেন, কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে একজন কর্মীর এইভাবে মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, আসিস ধর নিজেই তাঁর কাছে টেনশনের কথা বলেছিলেন। প্রশাসনের উচিত এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের উপর অযথা চাপ দেওয়া বন্ধ করা। 

এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মীদের উপর কাজের চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন বলে অনেকেই দাবি করেছেন। পরিজনদের দাবি, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত কারণ সামনে আনা হোক এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও কর্মী এই ধরনের চাপে প্রাণ না হারান, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

গত বছরের শেষভাগে অতিরিক্ত কাজের চাপে আরও এক বিএলও আত্মঘাতী হন। ঘটনাস্থল বাঁকুড়া। রানিবাঁধ এলাকায় আত্মঘাতী হন হারাধন মণ্ডল নামের এক ব্যক্তি। জানা গেছে, রানিবাঁধ বিধানসভার রাজাকাটা এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে। তিনি এক প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। রানিবাঁধ বিধানসভার ২০৬ নম্বর বুথে বিএলও-র দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন তিনি। গত রবিবার সকালে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে একটি সুইসাইড নোট। 

মৃত বিএলও-র পরিবারের তরফে জানা গেছে, এসআইআর শুরু হওয়ার পর থেকেই অতিরিক্ত কাজের চাপ ছিল। একাধিকবার জানিয়েও ছিলেন। রবিবার সকালে কাজের অজুহাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ বাড়ি না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিছুক্ষণ পর স্কুলের একটি ক্লাসরুম থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়‌। রানিবাঁধ থানার পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়েছে। 

এই ঘটনার পরেই রবিবার দুপুরে এক্স হ্যান্ডেলে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। তাঁর কথায়, 'মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। নির্বাচন কমিশন-এর অধীনে নিযুক্ত ও কাজে যুক্ত আরেকজন বিএলও অমানবিক চাপ সহ্য করতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করেছেন। বিশৃঙ্খল ও স্পষ্টতই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এসআইআর প্রক্রিয়ার নির্মম পরিণতি এটি।' 

অভিষেকের আরও বক্তব্য, 'ইতিমধ্যেই ৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, চরম মানসিক চাপ, ক্লান্তি ও ভয়ের কাছে হার মেনে। এই ভয় ও চাপ কোনও দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে ‘ভোটার-তালিকা সংশোধনের’ অভিযানের নামে, যার একমাত্র লক্ষ্য বিজেপির নির্বাচনী স্বার্থ। যে প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল ধীর, স্বচ্ছ ও পদ্ধতিগত, তা বুলডোজার চালিয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এখানে আর সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়, বরং এক দল ও এক ব্যক্তির রাজনৈতিক অঙ্ক মেলাতে মেরুদণ্ড বেঁকিয়ে দেওয়া এক আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।' 

বিজেপিকে কটাক্ষ করে তৃণমূল সাংসদ আরও লিখেছেন, 'আর বিজেপির কাছে? মানুষ যদি ক্লান্তিতে, হতাশায় বা ভয়ে মারা যায় তাহলে তা তাদের ক্ষমতার খেলায় 'সামান্য ক্ষতি', ক্ষমতা দখলের লোভের কাছে এক তুচ্ছ ঘটনা মাত্র। ইতিহাস সব দেখছে। বাংলা ক্ষমা করবে না। বাংলা ভুলবে না।'