আজকাল ওয়েবডেস্ক: আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হওয়ার আভাস মিলছে। ছোট ছোট বিরোধী দলগুলি ‘অ্যান্টি-তৃণমূল’ ও ‘অ্যান্টি-বিজেপি’ জোট গড়ার চেষ্টা শুরু করায় মুসলিম ভোটে বহু-কোণী বিভাজনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ৯.১২৭ কোটি জনসংখ্যার অন্তত ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের—ফলে এই ভোট যে কোনও নির্বাচনের ফল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত সপ্তাহে রাজনৈতিক মহলে চর্চার কেন্দ্রে আসে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। একসময় মুর্শিদাবাদ ও মালদহের মতো মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলিতে কংগ্রেসের দাপট ছিল। কিন্তু এবার তারা পুরনো জোটসঙ্গী সিপিআই(এম)-কে ছেড়ে এককভাবে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনও প্রাক্-নির্বাচনী সমঝোতায় যাবে না। ফলে বিরোধী শিবিরে সমন্বয়ের সম্ভাবনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই সামনে এসেছে মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের নাম। অযোধ্যার বাবরি মসজিদের আদলে একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করাকে কেন্দ্র করে তিনি দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হন। এরপরই তিনি ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
কবীর ইতিমধ্যেই সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গিয়েছে। উদ্দেশ্য—তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট গড়া। যদিও এই বৈঠক বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে। ফরওয়ার্ড ব্লক ও আরএসপি-র মতো শরিকরা বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানায় এবং ফ্রন্টের বৈঠকে তা নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়।
তবে মহম্মদ সেলিম জানিয়েছেন, “আমরা সব দল, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছি যাতে তৃণমূল ও বিজেপি-বিরোধী ভোট সর্বাধিক করা যায়। কিছু আলোচনা সফল হবে, কিছু নাও হতে পারে। ২০২৫ সালের পার্টি কংগ্রেসে আমরা এই অবস্থানই নিয়েছিলাম।” এছাড়াও সেলিম বলেন, হুমায়ুন কী ভাবছেন, কী করতে চাইছেন সেটা বুঝতে আলোচনায় গেছিলেন তিনি।
তবে বাস্তব রাজনৈতিক অঙ্ক বলছে, সিপিআই(এম) ও বামফ্রন্ট গত ১৪ বছরে তৃণমূলের কাছে হারানো রাজনৈতিক জমি আর ফিরে পায়নি। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় তাদের কোনও বিধায়ক নেই, লোকসভাতেও নেই কোনও সাংসদ। ভোট শতাংশের নিরিখেও পতন স্পষ্ট—২০০৯ সালে সিপিআই(এম)-এর ভোট ছিল ৩৩.১ শতাংশ। তা কমে ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৬.৩ শতাংশে এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে আরও নেমে ৫.৭ শতাংশে পৌঁছয়। সেই নির্বাচনে দল একটি আসনও জিততে পারেনি।
তবে মহম্মদ সেলিমের দাবি, হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে তাঁর বৈঠক কেবলমাত্র তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা জানার জন্যই হয়েছিল। অন্যদিকে এই কোথাও বাজারে ভাসছে যে, AIMIM-এর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন সেলিম। যদিও এই দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। রাজ্য সিপিএম সূত্রেও নস্যাৎ করা হয়েছে এই 'গুজবকে'। সিপিএম সূত্রে জানা গেছে, বিজেপির কারসাজি রয়েছে এই কানাঘুষো ছড়াবার পেছনে।
অন্যদিকে হুমায়ুন কবীরের বক্তব্য আরও স্পষ্ট। তাঁর দাবি, “আমি ৩০ বছর কংগ্রেসে ছিলাম। তাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত তৃণমূলের কাছে আত্মসমর্পণের শামিল। কংগ্রেস একটি আসনও পাবে না। যারা বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে চায় এবং তৃণমূলের বিরোধিতা করতে চায়, তাদের এক ছাতার তলায় আসা উচিত। AIMIM-সহ কোনও দলই অচ্ছুত নয়। বড় ফ্রন্ট গড়ে উঠছে।”
হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল AIMIM-এর ভূমিকাও নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে AIMIM পাঁচটি আসন জিতে মুসলিম ভোট ভাগ করে বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছিল। পরে ওয়াইসি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর দল ২০২১ সালের বঙ্গ ভোটেও লড়বে। যদিও সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি এবং AIMIM-এর ২১ জন সদস্য পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দেন।
এবার AIMIM-এর বঙ্গ ইউনিটের সভাপতি ইমরান সোলাঙ্কি জানিয়েছেন, “আমরা এ বছর একাধিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি কৌশল নির্ধারণের জন্য।”
সংখ্যালঘু সমাজের একটি অংশের মধ্যে তৃণমূলের প্রতি হতাশা বাড়ছে বলেও দাবি করছেন কিছু মুসলিম ধর্মগুরু। পশ্চিমবঙ্গ ইমামস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মাওলানা মহম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, “তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের নেতাদের দুর্নীতি মুসলিমদের একাংশকে হতাশ করেছে। আগে তাদের মধ্যে তৃণমূলের প্রতি সহানুভূতি ছিল। এখন আমরা শুনছি AIMIM-ও মাঠে নামছে।”
সব মিলিয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু ভোটকে ঘিরে একাধিক নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের একক লড়াই, হুমায়ুন কবীরের নতুন দল, AIMIM-এর সক্রিয়তা এবং বামেদের জোট-চেষ্টা—সব মিলিয়ে মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে একাধিক শক্তির লড়াই হতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বহুভাগে বিভক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত কাকে সুবিধা দেবে—তৃণমূল, বিজেপি নাকি কোনও নতুন জোট—তা নির্ভর করবে বিরোধী শিবির কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে তার উপর। আপাতত বাংলার রাজনীতি নতুন সমীকরণের অপেক্ষায়।
