আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঝাড়খণ্ডের পালামৌ জেলায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে সম্প্রতি অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যু হয় মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার বাসিন্দা আলাউদ্দিন শেখ নামে এক ব্যক্তির। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত ১৬ জানুয়ারি উত্তাল হয়ে ওঠে বেলডাঙার বিভিন্ন এলাকা। এবার সেই ঘটনার তদন্ত করতে নামল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। শনিবার সকাল ১০টা নাগাদ এনআইএ-র আট সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানায় পৌঁছে যান এই ঘটনার তদন্ত সংক্রান্ত যাবতীয় নথি সংগ্রহ করার জন্য। 

সূত্রের খবর, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশ পাওয়ার পর এনআইএ-র ইউএপিএ আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করে বেলডাঙা ঘটনার তদন্তভার নিজেদের হাতে নিয়েছে। শুক্রবারই এনআইএ-র তরফ থেকে একটি মামলা রুজু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শনিবার সকালে এনআইএ-র মহিলা এবং পুরুষ সদস্যের মোট আট জনের একটি তদন্তকারী দল বেলডাঙা থানায় পৌঁছে যান। এরপর তারা মুর্শিদাবাদ পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে সেখানে একটি বৈঠকে বসেছেন বলে জানা গিয়েছে। সেথেকে বেরিয়ে এনআইএ-র তিন অধিকারিক পৌঁছেছেন বহরমপুরে। প্রথমে তাঁরা পুলিশ সুপারের অফিসে যান। সেখানে কিছু নথি সংগ্রহের কাজ শেষে তাঁরা মুর্শিদাবাদ জেলা সিজেএম আদালতে যান।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কোর্টের নির্দেশ মেনে এনআইএ-র তদন্তকারী আধিকারিকদের হাতে এই মামলার এখনও পর্যন্ত হওয়া তদন্তের অগ্রগতি এবং তদন্তের যাবতীয় নথি তুলে দেওয়া হবে। সূত্রের খবর, পুলিশ এখনও পর্যন্ত যে ৩৬ জন দুষ্কৃতীকে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে তাদের সকলকে এনআইএ নিজেদের হেফাজতে নেবে এবং নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে। নথি হস্তান্তরে প্রক্রিয়া শেষ হলে এনআইএ-র তদন্তকারীরা বেলডাঙায় যে সমস্ত এলাকায় গত ১৬ এবং ১৭ তারিখে অশান্তির ঘটনা হয়েছিল সেখানেও যেতে পারেন বলে সূত্রের খবর।

প্রসঙ্গত, গত ১৬ জানুয়ারি বেলডাঙার বড়ুয়া মোড়ের কাছে ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক প্রায় সাত ঘন্টা অবরোধ করে রাখে উত্তেজিত জনতা। এর পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় লালগোলা-শিয়ালদা শাখায় ট্রেন চলাচল। ভোগান্তির মধ্যে পড়ে অসংখ্য মানুষ। অবরোধের সময়ে সাংবাদিকদেরকে মারধর করার পাশাপাশি সরকারি এবং বেসরকারি প্রচুর সম্পত্তি ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছিল বেশ কিছু দুষ্কৃতীর বিরুদ্ধে। আলাউদ্দিনের পরিবারের এক সদস্যকে চাকরি এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিন প্রশাসন অবরোধ তুলতে সক্ষম হলেও বিহারে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনার অভিযোগ তুলে ১৭ জানুয়ারি ফের একবার বেলডাঙায় পথ ও রেল অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায় উত্তেজিত জনতা। সেদিনও ভাঙচুর করা হয় বেশ কিছু সরকারি এবং বেসরকারি সম্পত্তি। এর পরেই কড়া পদক্ষেপ করে পুলিশ প্রশাসন। মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার সুপার কুমার সানি রাজের নেতৃত্বে সেদিন বিশাল পুলিশবাহিনী এলাকায় পৌঁছে লাঠিচার্জ করে অবরোধকারীদের হটিয়ে দেয়। 

এরপরই পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ এবং সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিও দেখে বেলডাঙা অশান্তির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। ধৃতরা বর্তমানে পুলিশ এবং জেল হেফাজতে রয়েছে। অন্যদিকে, আলাউদ্দিনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে মুর্শিদাবাদ পুলিশ ঝাড়খণ্ডে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, আলাউদ্দিনের সহকর্মী এবং সেখানকার পুলিশের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয় ওই ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছিল। বাংলা ভাষায় কথা বলা বা অন্য কোনও কারণে কেউ তাঁকে খুন করেনি। প্রাথমিক তদন্তে মুর্শিদাবাদ পুলিশ নিশ্চিত হয় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অশান্তি ছড়ানোর জন্য কেউ বা কারা আলাউদ্দিনের মৃত্যুকে সামনে রেখে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। 

বেলডাঙায় অশান্তির ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ শওকত আলি আলবেনি নামে এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ ওই ব্যক্তি গত ১৫ জানুয়ারি নিজের সমাজমাধ্যমের পাতা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লোকজনকে উত্তেজিত করার জন্য একটি পোস্ট করেছিলেন। এরপরই ১৬ তারিখ বেলডাঙায় ব্যাপক অশান্তি হয়। বেলডাঙায় অশান্তির ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন ‘এআইমিম’ দলের বেলডাঙা ব্লক সভাপতি মতিউর রহমান-সহ আরও বেশ কিছু ব্যাক্তি। ধৃতদের সকলের বিরুদ্ধে বেলডাঙায় অশান্তির ঘটনায় মদত দেওয়া, উত্তেজনা ছড়ানো, লোক জড়ো করা, সম্পত্তি ভাঙচুর, মারধর, বেআইনিভাবে লোকেদের আটকে রাখা-সহ আরও একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত চালাচ্ছে বেলডাঙা থানার পুলিশ।