আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। অবশেষে মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্য এবং গর্বের প্রতীক মুর্শিদাবাদ সিল্ক পেতে চলেছে জিআই ট্যাগ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বহরমপুরের তৃণমূল সাংসদ ইউসুফ পাঠান দেশের সংসদে  'জিরো আওয়ার'-এ মুর্শিদাবাদের সিল্ক থান শিল্পের জন্য  বক্তব্য রেখে জানতে চেয়েছিলেন কবে এই শিল্প জিআই ট্যাগ পাবে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয়  শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতেন প্রসাদ  তৃণমূল সাংসদের প্রশ্নের লিখিত উত্তরে জানিয়েছেন, কোনও আপত্তি জমা না পড়লে ২৫  মার্চের পরই মুর্শিদাবাদ সিল্ককে জিআই ট্যাগ দেওয়ার জন্য রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া চালু হয়ে যাবে।
 
প্রসঙ্গত, এর আগে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত মিষ্টি ছানাবড়া , গরদ ও কোরিয়াল শাড়ি এবং বালুচরি শাড়ি জিআই ট্যাগ পেয়েছে।  মুর্শিদাবাদ  সিল্ক জিআই ট্যাগ পেলে জেলার মুকুটে নতুন সম্মানের পালক যোগ হবে। 

সূত্রের খবর, ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের খাগড়া ললিত মোহন রেশম খাদি সমিতির পক্ষ থেকে 'মুর্শিদাবাদ সিল্ক'-এর জন্য জিআই ট্যাগের  আবেদন জানানো হয়েছিল। বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর মুর্শিদাবাদ সিল্কের জিআই ট্যাগ নিয়ে কারও কোনও আপত্তি থাকলে তা জানানোর জন্য নোটিফিকেশন জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে কেউ কোনও আপত্তি জমা না দিলে 'মুর্শিদাবাদ সিল্ক' পেতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত দুর্লভ এক সম্মান। 'মুর্শিদাবাদ সিল্ক' এই সম্মান পেলে তা জেলার হস্তশিল্পীদের জন্য একটি বড় মাইলফলক হবে। যা তাঁদের পণ্যের গুণমান এবং ভৌগোলিক পরিচয়কে আইনত সুরক্ষিত করবে। 

ঐতিহাসিকেরা বলেন, মুর্শিদাবাদ সিল্কের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মুঘল যুগে বিশেষ করে নবাব মুর্শিদকুলি খান-এর সময় থেকে মুর্শিদাবাদ জেলা রেশম উৎপাদনের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুর্শিদাবাদের মির্জাপুর, জিয়াগঞ্জ, ইসলামপুরের মতো গ্রামগুলোয় হাজার হাজার তাঁতি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রেশমের সুতো থেকে সিল্কের শাড়ি এবং অন্যান্য জিনিস তৈরি করে আসছেন। 'মুর্শিদাবাদ সিল্ক' বললে সাধারণত  রেশমের তৈরি শাড়ি ,স্কার্ফ , রুমালের মতো জিনিসকে বোঝায়। তবে এর মধ্যে গরদ,প্রিন্টেড সিল্ক ও অন্য কিছু বৈচিত্রও রয়েছে। 

ললিত মোহন রেশম খাদি সমিতির সম্পাদক নিত্যানন্দ চৌধুরী বলেন,"মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্প এবং সিল্ক  অত্যন্ত প্রাচীন এক শিল্প। এর পরিচিতি এবং গ্রহণযোগ্যতা এখন দেশ জুড়ে রয়েছে। রাজ্য খাদি ও গ্রামীণ শিল্প পর্ষদের সহায়তায় আমরা ২০২৩ সালে 'মুর্শিদাবাদ সিল্ক'-এর জিআই ট্যাগের জন্য আবেদন করেছিলাম।"
 
তিনি বলেন,"মুর্শিদাবাদের রেশম শিল্পীরা 'তানা' এবং 'বানা' (ভার্টিক্যাল এবং হরাইজেন্টাল) পদ্ধতিতে যেভাবে সিল্কের শাড়ি বোনেন তার কদর কেবল এই রাজ্য এবং দেশে নয় বিদেশেও রয়েছে। মুর্শিদাবাদের নগর, ডাঙ্গাপাড়া, খড়গ্রাম ,পিয়ারাপুর,দৌলতাবাদ জিয়াগঞ্জ-সহ আরও  কয়েকটি এলাকায় বংশ পরম্পরায় 'ক্লাস্টারে' রেশম উৎপাদন এবং সিল্কের শাড়ি তৈরি হয়।"

নিত্যানন্দবাবু জানান,"কেবল মুর্শিদাবাদ  জেলাতেই প্রায় দেড়শোর উপর খাদি সংস্থার দোকান রয়েছে। এই সমস্ত দোকানে প্রচুর শিল্পী মুর্শিদাবাদ সিল্কের তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করেন, যা পরবর্তীকালে ক্রেতারা আমাদের কাছ থেকে খরিদ করেন। খাদি সংস্থা ছাড়াও জেলার প্রচুর বড় দোকানে সিল্কের  জিনিস বিক্রি হয়।"
 
তিনি আরও জানান,"পলু পোকা পালন থেকে রেশমের বিভিন্ন রকমের জিনিস তৈরি পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় মুর্শিদাবাদ জেলাতেই কয়েক হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছেন এবং এই জেলায় প্রত্যেক বছর কয়েকশো কোটি টাকার সিল্কের 'প্রোডাক্ট' বিক্রি হয়। আমাদের আশা মুর্শিদাবাদ সিল্ক জিআই ট্যাগ পেয়ে গেলে বিদেশের বাজারে আমাদের জেলার হস্তশিল্পীদের কদর বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সিল্কের চাহিদা বাড়বে। পাশাপাশি হাজার হাজার তাঁতি পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং এই শিল্পর ভবিষ্যৎ মজবুত হবে।"

বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখার্জী বলেন ,"আমাদের বহরমপুরের সাংসদ বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ সিল্ক  জিআই ট্যাগ পেতে চলেছে। জেলার সমস্ত মানুষ এবং যারা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাঁদের কাছে এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর।"