আজকাল ওয়েবডেস্ক: মকর সংক্রান্তির পূণ্যতিথিতে বুধবার বীরভূমের জয়দেব কেন্দুলি মেলায় লক্ষাধিক পূণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই অজয় নদের তীরে ভক্তদের ঢল নামে। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে মানুষ অজয় নদের জলে নেমে পুণ্যস্নান করেন এবং স্নান শেষে রাধাবিনোদ মন্দিরে পুজো দিয়ে সংসারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের আবেশে এই দিনে জয়দেব কেন্দুলি মেলা এক বিশাল ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়।
সরকারিভাবে মঙ্গলবার ১৩ জানুয়ারি জয়দেব কেন্দুলি মেলার উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এসআরডিএ-র চেয়ারম্যান ও বীরভূম তৃণমূল কংগ্রেসের কোর কমিটির আহ্বায়ক অনুব্রত মণ্ডল, কারামন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা, জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ, জেলাশাসক ধবল জৈন, জেলা পুলিশ সুপার আমনদীপ সিং-সহ একাধিক জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্তা। তাঁদের উপস্থিতিতে মেলার সূচনা হলেও প্রকৃত অর্থে মকর সংক্রান্তির দিনেই মেলার সর্বাধিক ভিড় ও ধর্মীয় তাৎপর্য ফুটে ওঠে।
জয়দেব কেন্দুলির সঙ্গে মকর সংক্রান্তির গভীর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় যোগ রয়েছে। লোককথা অনুযায়ী, গীতগোবিন্দের রচয়িতা কবি জয়দেব একসময় অসুস্থ হয়ে পড়ায় মকর সংক্রান্তির পুণ্যস্নানে অংশ নিতে পারেননি। তখন ভক্তির টানে স্বয়ং মা গঙ্গা অজয় নদের উজানে এসে কবিকে পুণ্যস্নানের সুযোগ দেন। সেই বিশ্বাস থেকেই অজয় নদের জলকে গঙ্গাজলের সমতুল্য বলে মনে করা হয় এবং এই দিনে এখানে স্নানের বিশেষ সমাগম হয়। আজও অগণিত মানুষের মনে অটুট রয়েছে ভক্তি ও বিশ্বাস।

পুণ্যস্নান ও পুজোর পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির নানা ধারাও মেলায় বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে। বিভিন্ন আখড়ায় বাউল গান, কীর্তন ও সাধনসংগীত পরিবেশিত হয়। একতারা ও খোলের তালে তালে ভক্তি ও আনন্দের আবহ তৈরি হয়। রাতভর বাউল ও ফকিরদের সাধনসংগীতে মেতে ওঠা এবং দর্শনার্থীদের সেই সঙ্গীত উপভোগ করা মেলার এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
জয়দেব কেন্দুলি মেলা গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মেলা বিশেষভাবে পরিচিত কলা ও মাছের জাল বিক্রির জন্য। বীরভূম-সহ প্রতিবেশী বিভিন্ন জেলা থেকে কলা ব্যবসায়ী ও মাছের জাল বিক্রেতারা প্রতিবছর নিয়ম করে এখানে যোগ দেন। সারা বছরের প্রস্তুতি নিয়ে তাঁরা মেলায় আসেন এবং পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কাছেও তাঁদের পণ্য বিক্রি করেন। বিক্রি ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সন্তুষ্ট থাকেন এবং এই মেলাকে তাঁদের বার্ষিক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই দেখেন। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এই মেলা গ্রামীণ বাণিজ্য ও জীবিকার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
এ ছাড়াও মেলায় হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, বেতের সামগ্রী, খেলনা ও খাদ্যপণ্যের নানা পসরা বসে। পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীরা স্নান ও পুজোর পাশাপাশি কেনাকাটায় মেতে ওঠেন। শিশুদের জন্য খেলনা, প্রবীণদের জন্য ধর্মীয় সামগ্রী এবং সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিস মেলার আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলে।
মকর সংক্রান্তির দিনে জয়দেব কেন্দুলি মেলা তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও জীবিকার এক সম্মিলিত রূপ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব মানুষের মনে গভীর শিকড় গেড়ে বসে আছে। ধর্মীয় আচার, লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের এই মিলনই জয়দেব কেন্দুলি মেলাকে বাংলার ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
