বিভাস ভট্টাচার্য: নেতা-নেত্রীদের গরম গরম ভাষণ। মাঝে মাঝেই সভা এবং সেইসঙ্গে বিতর্ক। যা প্রমাণ করে বসন্তর সঙ্গে সঙ্গে ভোটও আসছে। সেই ভোটের আবহেই রবিবার কেন্দ্রীয় বাজেটে বিড়ি শ্রমিকদের জন্য বড় সুখবর এল দিল্লি থেকে। বাজেটে এই শিল্পকে 'রেহাই' দিয়ে প্রস্তাবিত জিএসটি 'স্ল্যাব' ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করার কথা ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণ এবং নতুন কর কাঠামো রবিবার থেকেই চালু হয়ে যাচ্ছে। যার জেরে আশায় বুক বাঁধছেন বিড়ি শ্রমিকরা। তাঁদের বিশ্বাস এবার তাঁরা সঠিক মজুরি পাবেন। 

রাজ্যে বিড়ি শিল্পে মুর্শিদাবাদ এবং মালদা এই দুটি জেলার নাম একেবারে উপরে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ। এই জেলায় ছোট এবং বড় মিলিয়ে ১০০র বেশি বিড়ি কারখানা আছে। জেলার প্রায় ১৭ লক্ষ মানুষ এই কারখানার সঙ্গে জড়িত এবং এই শ্রমিকরা প্রায় সকলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অংশ। পাশের জেলা মালদাতেও বিড়ি শ্রমিকদের প্রায় সকলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাসিন্দা। 

রাজ্য রাজনীতিতে একটা কথা চালু আছে, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কের একটি বড় অংশ হল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার। এবছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেখানে থাবা বসাতে ইতিমধ্যেই তৎপরতা লক্ষ্য করা গিয়েছে বিরোধী বিভিন্ন দলগুলির মধ্যে। তৃণমূল থেকে 'সাসপেন্ডেড' হওয়া মুর্শিদাবাদ জেলার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর তাঁর প্রস্তাবিত 'বাবরি' মসজিদের শিলান্যাস করেছেন এবং সেইসঙ্গে গঠন করেছেন তাঁর নতুন রাজনৈতিক দল 'জনতা উন্নয়ন পার্টি' বা জেইউপি। মুসলিম সমাজকে নিজের দিকে টানতে দিয়েছেন একাধিক বার্তা। দাবি করেছেন, এবছর বিধানসভা নির্বাচনের পর তিনি এবং তাঁর দল হয়ে উঠবেন রাজ্যে সরকার গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চেষ্টা করছেন সিপিএম, আইএসএফ-সহ বিভিন্ন বিরোধী দলগুলির সঙ্গে জোট গঠন করতে। এককথায় তাঁর লক্ষ্য হল সংখ্যালঘু ভোটারদের তৃণমূলের দিক থেকে সরিয়ে আনা। 

এর পাশাপাশি  তৃণমূল থেকে ইতিমধ্যেই কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন মালদার প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ এবং প্রয়াত রেলমন্ত্রী গণিখান চৌধুরীর ভাগ্নী মৌসম বেনজির নূর। রাজ্যের আরেক সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই জেলায় এখনও গণিখান চৌধুরীর 'নামটা' সাধারণ মানুষের কাছে একটা যথেষ্টই বড় বিষয়। রাজনৈতিক মহলের মতে মৌসম তৃণমূলে যোগদানের পর সেই ভোট কিছুটা তৃণমূল এবং কিছুটা কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছিল। মৌসম ফিরে আসায় এবার মালদা নিয়ে কংগ্রেস নতুন করে আবার কোমড় বাঁধতে শুরু করেছে। এককথায় এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলগুলির অন্যতম লক্ষ্য সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসানো। 

সেই আবহেই এবার রবিবার অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের  বিড়ি শিল্পে এই কর ছাড়ের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবেই আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে। এবিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, "আমরা দেখেছিলাম বিহারে ভোটের আগে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ ছিল। আবার চন্দ্রবাবু নাউডুর জন্যও আর্থিক বরাদ্দ ছিল। অথচ এই বাজেটে বাংলার জন্য কিছুই বরাদ্দ করা হয়নি। সেখানে এটা লোক দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে বিজেপি প্রতিদিন সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে যে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে তার থেকে দৃষ্টি ঘোরাতেই এই লোকদেখানো বিষয়টি করল। এই যে জিএসটি কমানো হল সেখানে কিন্তু শ্রমিকদের কোনো লাভ হল না। লাভ হল মালিকদের। সরকার যদি শ্রম কোড সঠিকভাবে লাগু করত বা শ্রমিকের কাজের অধিকারকে সঠিকভাবে মান্যতা দিত তাহলেই সেটা শ্রমিকদের কাজে লাগত। এটা একেবারেই ভোটের জন্য করা।" 

বিষয়টি 'গিমিক' বলে ব্যাখ্যা করে রাজ্য সিপিএম নেতা কৌস্তুভ চ্যাটার্জি বলেন, "নির্বাচনের আগে এটা একটা রাজনৈতিক চমক বা গিমিক ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ কিন্তু বুঝে গিয়েছেন বিজেপি বা তৃণমূল কংগ্রেস কারুর আমলেই কিন্তু তাঁদের প্রতিদিনের জীবন যন্ত্রণা লাঘব হচ্ছে না। ফলে এই সমস্ত চমকের মাধ্যমে বিজেপির আদৌ কিছু লাভ হবে না। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করছে‌‌। কারণ বিজেপি চায় রাজ্যে সংখ্যালঘুদের ভোট যেন তৃণমূলের দিকেই যায়।" 

গোটা বিষয়টি নিয়ে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র আইনজীবী দেবজিৎ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, "কে বলল বিড়ি শুধু সংখ্যালঘুরাই বাঁধেন‌। সংখ্যাগুরু হিন্দুরাও বিড়ি বাঁধার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যেখানে বিড়ি বাঁধার কাজটা হয় সেখানে তথাকথিত সংখ্যালঘুরা হলেন সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যাগুরুরা হলেন সংখ্যালঘু। শুধু কি বিড়ি শিল্প? কলকাতা মেট্রো, জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কলকাতা শাখা, টি বোর্ড , বেঙ্গল কেমিক্যাল, সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউট-সহ একাধিক বিষয়ের জন্য বাজেটে আর্থিক বরাদ্দ করা হয়েছে। এগুলোর কোনো দাম নেই! শুধু ওইটা নিয়েই আলোচনা? আমাদের কোনো কিছুতেই ওঁরা লাভ দেখবেন না! যদিও লাভ-ক্ষতি ওঁদের আর বেশিদিন দেখতেও হবে না‌। শিলিগুড়ি কড়িডোর হচ্ছে। ইসলামপুরে তো সংখ্যালঘুতে ভর্তি‌। এই যে বনগাঁ বা রানাঘাটে নতুন ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে কি সংখ্যালঘু নেই? আসলে উন্নয়নের বিষয়ে আমরা কোনো বিভাজনের রাজনীতি করি না।"